যুক্তরাষ্ট্র   বৃহস্পতিবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,১ আশ্বিন ১৪৩৩

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ: সম্ভাবনা ও ঝুঁকি

পপি দেবী থাপা

পপি দেবী থাপা

প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৪ PM | সর্বশেষ আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২৪ PM ৮৩
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ: সম্ভাবনা ও ঝুঁকি

ছবি : সবুজ নিশান

মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্ব নিজের হাতে নিয়ে আঞ্চলিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার চেষ্টা সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের। সমালোচকদের মতে, এ পথে এমনকি ইসরাইলের সঙ্গে আপোষমূলক শত্রুতার ভূমিকাও দেখা গেছে। তবে নিরাপত্তার প্রশ্নে মূল নির্ভরতা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান আক্রমণ এবং তার পরবর্তী হিসাব-নিকাশ সেই চিত্র বদলে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর পাশাপাশি যুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, সমুদ্রপথের নিরাপত্তাহীনতা এবং মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। সেই প্রেক্ষাপটেই ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি।

চুক্তির মূল রাজনৈতিক বার্তা হলো, এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে অন্য সদস্যদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা। এ কারণে একে দেখা হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের সম্ভাব্য নতুন নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে। অনেকে একে মুসলিম ন্যাটো বললেও এটিকে এখনই ন্যাটোর সমতুল্য বলা অতিরঞ্জিত। আবার চুক্তিটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি, তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পাকিস্তানের অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী ও পারমাণবিক সক্ষমতার সমন্বয় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণের ইঙ্গিত। একই সঙ্গে এটি তুলে ধরছে এমন এক বাস্তবতা যেখানে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বাইরের শক্তির ওপর এককভাবে নির্ভর না করে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে। চুক্তিটিকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে বলা না হলেও ইরান-ইসরায়েল প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আঞ্চলিক সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যে পরিবর্তিত মার্কিন ভূমিকার প্রেক্ষাপট থেকে একে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতার এমন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের বিষয়টি বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে দেখছে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলেও কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। তবে ইতিবাচক আগ্রহ আর চূড়ান্ত সদস্যপদ এক বিষয় নয়। দেখার বিষয়, বাংলাদেশ পূর্ণ সদস্য হয়ে একটি সামরিক নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হবে নাকি সীমিত সহযোগিতার পথ বেছে নেবে?

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য লাভও রয়েছে। সৌদি আরব শ্রমবাজার, জ্বালানি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তুরস্ক প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক প্রযুক্তিতে সহায়তা করতে পারে এমন সম্ভাবনা রয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক সব সময় সহজ না হলেও নতুন নিরাপত্তা কাঠামো যোগাযোগ ও সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। যা বাংলাদেশের জন্য প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন সুযোগ সুযোগ হিসেবে দেখছেন অনেকেই। কূটনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিকের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হলে বাংলাদেশ আরও বিস্তৃত কৌশলগত পরিসরে ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে। আর এখানেই শুরু কঠিন হিসাবের।

যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্য হওয়া শুধু সুবিধা গ্রহণের বিষয় নয়, সঙ্গে দায়িত্ব এবং সম্ভাব্য সামরিক বাধ্যবাধকতাও যুক্ত থাকে। সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ, তুরস্কের আঞ্চলিক স্বার্থ আর পাকিস্তানের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার আমাদের দেশের বাস্তবতার সঙ্গে এক নয়। ভবিষ্যতে কোনো সদস্য রাষ্ট্র সংঘাতে জড়ালে বাংলাদেশ কতটা এবং কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে—এ বিষয় স্পষ্ট হওয়া ছাড়া সদস্যপদ নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের কৌশলগত ভারসাম্য। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়েছে। এই নীতির কারণেই বাংলাদেশ একই সঙ্গে পশ্চিমা বাজারে রপ্তানি বাড়িয়েছে, চীনের সঙ্গে গড়ে তুলেছে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার থেকে বিপুল রেমিট্যান্স পেয়েছে। কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলেই যে বহুমুখী সম্পর্ক ভেঙে পড়বে এমন নয় কিন্তু বাংলাদেশ কোন কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে উঠবে।

এখানে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত কোনো নিরাপত্তা কাঠামোয় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নয়াদিল্লির কাছে স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা পশ্চিম এশিয়ার ঘটনাপ্রবাহ ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এমন সময়ে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সদস্যপদ দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে, যখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক ইতোমধ্যেই নানা কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তবে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত অন্য কোনো দেশের পছন্দ বা অপছন্দের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না; এর একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থ। একই সঙ্গে সেই জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণে ভারতকে পুরোপুরি উপেক্ষা করাও বাস্তবসম্মত নয়। অর্থনীতি, যোগাযোগ, নদী, সীমান্ত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ বহু ক্ষেত্রে দুই দেশ গভীরভাবে যুক্ত। তাই বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে নয়াদিল্লিকে স্পষ্টভাবে বোঝাতে হবে-এটি কোনোভাবেই ভারতবিরোধী সামরিক অবস্থান নয়।

চীনও বিষয়টি নতুন কৌশলগত হিসাবের মধ্য দিয়ে দেখবে। পশ্চিমা নিরাপত্তা নির্ভরতার বিকল্প হিসেবে বহুমেরু কাঠামো গড়ে উঠলে বেইজিং সেটিকে সরাসরি নেতিবাচকভাবে নাও দেখতে পারে। তবে বাংলাদেশের নতুন সামরিক প্রতিশ্রুতি চীনের সঙ্গে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে জটিল করে কি না, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের কাছেও বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা, বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা এবং পূর্বানুমানযোগ্য কূটনৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চয়ই লক্ষ্য করবে, এই নতুন নিরাপত্তা কাঠামো মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব ও ভূমিকার ওপর দীর্ঘমেয়াদে কী প্রভাব ফেলে এবং বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক শিবিরে স্থায়ীভাবে অবস্থান নিচ্ছে কি না।

চুক্তির বাইরে থাকা মুসলিম দেশগুলোর প্রতিক্রিয়াও একরকম হবে না। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ওমান নিজেদের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে বিষয়টি মূল্যায়ন করবে। ইরানের অবস্থান আরও সংবেদনশীল। চুক্তিটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয় বলে ঘোষণা করা হলেও আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতায় একে কীভাবে দেখা হবে, তা ভবিষ্যতের ঘটনাপ্রবাহের ওপর নির্ভর করবে। বাংলাদেশের তাই কোনো সাম্প্রদায়িক বা সুন্নি-শিয়া বিভাজনের অংশ না হয়ে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার নীতিই অনুসরণ করা উচিত।

বাস্তবসম্মত পথ হলো তাড়াহুড়া না করে ধাপে ধাপে এগোনো। চুক্তির শর্ত, সামরিক বাধ্যবাধকতা ও সদস্য আক্রান্ত হলে বাংলাদেশের দায়িত্ব আগে স্পষ্ট করা জরুরি। সংসদ, কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে জাতীয় আলোচনা প্রয়োজন। পূর্ণ সদস্যপদের আগে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক সহযোগিতার মতো সীমিত ক্ষেত্র দিয়ে শুরু করলে সুবিধা মিলবে এবং কৌশলগত স্বাধীনতাও বজায় থাকবে।

মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য শুধু ধর্মীয় সংহতি বা প্রতীকী কূটনীতির প্রশ্ন নয়, এটি ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় পরীক্ষা। নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্য সুযোগের দরজা খুলতে পারে। তবে সেই দরজা দিয়ে প্রবেশের আগে ঢাকাকে ভাবতে হবে-নতুন নিরাপত্তার ছাতার বিনিময়ে যেন স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি, হারিয়ে না যায়।
 

লেখক: গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী।

মক্কা চুক্তি সৌদি আরব তুরস্ক পাকিস্তান বাংলাদেশ যোগদান ইতিবাচক আমন্ত্রন সম্ভাবনা ঝুঁকি লাভ ক্ষতি

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!