অপ্রতিম হত্যা মামলার আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ; ছবি: সংগৃহীত
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা মামলার আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ নিহতের বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ করতেন। অপ্রতিমের বাবা জানিয়েছেন, চলতি মাসের ২ সেপ্টেম্বর ১৪ হাজার টাকা মাসিক বেতনে ফাহাদকে কাজে নেওয়া হয়। তখনও তার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি হয়নি।
কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট মার্কেটে ফিরোজ শাহরিয়ারের মোবাইল সরঞ্জামের শোরুম রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ফাহাদের বাবা-মায়ের অনুরোধেই তাকে কাজে নেওয়া হয়েছিল এবং মাস শেষে চুক্তিপত্র করার পরিকল্পনা ছিল। ফাহাদের সঙ্গে অপ্রতিমেরও বিশেষ কোনো ঘনিষ্ঠতা বা বিরোধ ছিল না বলে জানিয়েছেন তিনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে ফাহাদসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অপ্রতিমকে নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বাধা দেওয়ার পর ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তুহিন প্রথমে এবং পরে ফাহাদ ও কামরুল আঘাত করেন বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের পর তুহিনকে শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফাহাদ ও কামরুলকে হেফাজতে নেওয়া হয় এবং ফোনটি উদ্ধার করা হয়।
রোববার কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে জানান, শুক্রবার বিকেলে অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে তুহিন সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা একটি নির্জন স্থানে যায়। পুলিশের দাবি, সেখানে আইফোন নেওয়ার চেষ্টা করা হলে অপ্রতিম বাধা দেয় এবং ধস্তাধস্তি হয়। এরপর তাকে আঘাত করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
এদিকে তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি ফাহাদের কাছে অপ্রতিমের পাঁচ হাজার টাকা পাওনা থাকার তথ্যও উঠে এসেছে। ফাহাদ ওই টাকা ধার নিয়েছিলেন এবং সম্প্রতি তা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে অপ্রতিমের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তবে তদন্তের এই অংশ এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত কোনো মোটিভ হিসেবে বিবেচিত নয়।
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারও ফাহাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। পরিবারের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনকে দেখা গেলে ফাহাদ তাকে শনাক্ত করেন বলে অপ্রতিমের বাবা জানিয়েছেন। পরে তুহিনকে ফোন করে অপ্রতিম সম্পর্কে জানতে বলা হলেও সে অপ্রতিম তার কাছে যায়নি বলে জানায়।
পরদিন অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর ফাহাদকেও পরিবারের সঙ্গে ঘটনাস্থলে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তবে অসুস্থ বোধ করার কথা জানিয়ে তিনি সেখান থেকে চলে যান বলে অপ্রতিমের বাবা জানিয়েছেন।
অপ্রতিম হত্যা মামলায় বর্তমানে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার তিনজন হলেন সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ও মো. কামরুল হাসান (১৬)। এ ছাড়া সিয়াম (১৯) নামে আরেকজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চারজনকেই কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং বয়স কম হওয়ায় ফাহাদ ও কামরুলকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
এর আগে রোববার রাতে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন বলে ইত্তেফাক জানিয়েছে। তবে আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বিস্তারিত বিষয়বস্তু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অপ্রতিম হত্যার তদন্ত এখনো চলমান। পুলিশ বলছে, উদ্ধার হওয়া সিসিটিভি ফুটেজ, আসামিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতে ঘটনার পুরো প্রেক্ষাপট যাচাই করা হচ্ছে। ফলে আইফোন নেওয়া বা পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধ—কোনটি হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল, তা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!