যুক্তরাষ্ট্র   বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,৩১ ভাদ্র ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম উঠল রেকর্ড ৬.২৩ ডলারে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫৭ PM
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম উঠল রেকর্ড ৬.২৩ ডলারে

যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডিজেলের দাম নতুন রেকর্ড গড়েছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (AAA) হিসাব অনুযায়ী, সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর দেশটিতে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় মূল্য বেড়ে ৬ দশমিক ২৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। দেশটির ইতিহাসে এর আগে ডিজেলের গড় দাম এত বেশি পর্যায়ে ওঠেনি।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা জ্বালানির দামে এই বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা স্থগিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে।

সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারে উঠে যায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল বা ইউএস ক্রুডের দামও ১০৩ ডলার স্পর্শ করে। সৌদির গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইনে সাম্প্রতিক হামলার পর থেকেই সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বাজারে উদ্বেগ বাড়ছিল।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প পথগুলোর গুরুত্ব বেড়ে গেছে। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহন নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুট হিসেবে সামনে আসে। তবে সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানায়, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এটি আবার কবে চালু হবে, সে বিষয়ে তখন কোনো নির্দিষ্ট সময় জানানো হয়নি।

একই সময়ে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি সমুদ্রপথ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে যে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, সেটিও রোববার বিকেলে স্থগিত করা হয়।

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরির জন্য বৈঠকটি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়, সৌদি আরবের অনুরোধেই বৈঠক স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার চিত্রও আন্তর্জাতিক উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, রোববার মাত্র ১৪টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। এর আগের দিন শনিবার ১২টি, শুক্রবার ১১টি এবং বৃহস্পতিবার মাত্র ৯টি জাহাজ ওই জলপথ পার হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার প্রভাব এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। সোমবার দেশটিতে সাধারণ পেট্রোলের গড় দাম বেড়ে প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ৩১ ডলারে পৌঁছেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ জ্বালানির দাম ৪৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধির হার ৫০ শতাংশেরও বেশি। তবে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে ডিজেলের রেকর্ড মূল্য।

পরিবহন খাতে ডিজেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় এর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু জ্বালানি খরচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ট্রাক, জাহাজ ও রেলপথে পণ্য পরিবহনে ব্যাপকভাবে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়লে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ডিজেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে এমন উচ্চ পর্যায়ে থাকলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের সেবা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ পণ্য উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহের সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় সরাসরি যুক্ত।

কেপিএমজির প্রধান অর্থনীতিবিদ ডায়ান সোয়াঙ্ক সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ডিজেলের বাড়তি খরচ অর্থনীতির প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ জ্বালানির বাজারে তৈরি হওয়া চাপ ক্রমে ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যেও প্রতিফলিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং বিকল্প তেল সরবরাহ রুটের কার্যক্রম বন্ধ থাকার মতো ঘটনাগুলো শুধু আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বাজারকেই প্রভাবিত করছে না; এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজারেও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ডিজেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠায় সেই প্রভাব এখন দেশটির পরিবহন ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!