যুক্তরাষ্ট্র   বুধবার ১৪ অক্টোবর ২০২৬,২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

ডেঙ্গু ও হামের রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে চাপ

সবুজ নিশান ডেস্ক

সবুজ নিশান ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৩ PM ৪৬
ডেঙ্গু ও হামের রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে চাপ

ডেঙ্গু-হামের বাড়তি রোগীতে চাপে হাসপাতাল ছবি: সংগৃহীত

দেশে ডেঙ্গু ও হামের সংক্রমণ একসঙ্গে বাড়ায় চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ডেঙ্গুতে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮৪ জনে। একই সময়ে ১ হাজার ৫৯৩ জন নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফলে চলতি বছর ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬১ হাজার ৯৭২ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৫৭ হাজার ৬১০ জন। অন্যদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম বা হামের উপসর্গে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৭ জন।

হামের হিসাবে একই সময়ে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮১৪। এর মধ্যে ২০ হাজার ৫৬২ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে এবং ১ লাখ ৫৮ হাজার ৫৮৯ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ৫২ হাজার ২২৫ জন। এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ১০১ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৬০ হাজার ৩৭৯ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ১৭৮ জনের। এরপর একদিনেই আরও ১ হাজার ৫৯৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং ছয়জনের মৃত্যুতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা আরও বেড়েছে।

এর আগে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৫৮ হাজার ৪০০। তখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছিল ১৭৬ জনের। ওই ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৪৮৪ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন, পাঁচজনের মৃত্যু হয় এবং ১ হাজার ৫১৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৭ দিনেই ২২ হাজার ৫৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় এবং ৭৯ জনের মৃত্যু হওয়ায় ওই মাসটি তখনই সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও মৃত্যুর মাসে পরিণত হয়েছিল।

পরে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৬ হাজার ১২৬ জন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৮৭ জনের। অর্থাৎ মাস শেষ হওয়ার আগেই চলতি বছরের সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ও মৃত্যুর মাস হিসেবে সেপ্টেম্বরের চিত্র সামনে এসেছে।

একই সময়ে হাসপাতালগুলোতে রোগীর অতিরিক্ত চাপ সামলাতে নানা ধরনের ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালে নির্ধারিত শয্যার বাইরে রোগী রাখতে হয়েছে। কোনো হাসপাতালে সাধারণ ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, আবার কোথাও মেঝেতে অস্থায়ী শয্যা তৈরি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শিশুদের কেউ কেউ একই সঙ্গে জ্বর, ডেঙ্গু ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসায় চিকিৎসকদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই চাপের একটি চিত্র দেখা গেছে। পাঁচ বছর বয়সী নাফিয়া পাঁচ দিন জ্বরে ভোগার পর ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে সেখানে ভর্তি হয়। তার বাবা নূর আলম জানিয়েছেন, শিশুটির ডেঙ্গু ও হাম দুটোই শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষায় হৃদযন্ত্রে ছিদ্রের বিষয়টিও ধরা পড়ে। নাফিয়ার মা মাহমুদা আক্তারের ভাষ্য, চিকিৎসক সকালে শিশুটির শারীরিক অবস্থা ভালো নয় বলে জানিয়েছেন।

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে অনেক রোগীকে ক্যানুলা দিয়ে স্যালাইন নিতে দেখা যায়। কেউ শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছে, আবার জায়গার সংকটে কারও জন্য মেঝেতেই বিছানা পাতা হয়েছে। নয় বছর বয়সী শারিনা এক সপ্তাহ ধরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। হাসপাতালে ভর্তি করার পর তাঁর প্লাটিলেট কমে ৩৪ হাজারে নেমে যায়। চিকিৎসকেরা রক্তদাতা প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর রক্তচাপও ওঠানামা করছে।

১১ বছর বয়সী আয়েশাও ডেঙ্গু নিয়ে তিন দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। এক সপ্তাহ ধরে অসুস্থ এই শিশুর জন্য শয্যার সংকটে মেঝেতে বিছানা করা হয়েছে। বাবা সাজিব জানান, পরীক্ষার ফল মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও মেয়ের শারীরিক অবস্থার তেমন উন্নতি হচ্ছে না।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও নির্ধারিত শয্যার তুলনায় ডেঙ্গু রোগী বেশি ভর্তি হয়েছেন। ১ হাজার ৩৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ১৯১টি শয্যা নির্ধারিত থাকলেও একপর্যায়ে সেখানে ২৪৭ জন ভর্তি ছিলেন। ফলে সাধারণ মেডিসিন ওয়ার্ড ও মেঝেতেও রোগী রাখতে হয়েছে। পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহৃত ৪২০ নম্বর ওয়ার্ডও ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় কাজে লাগানো হচ্ছে। হাসপাতালটির পরিচালক নন্দ দুলাল সাহা জানান, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবল এখনো পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও বাড়তি রোগীর চাপ রয়েছে। ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে চলতি বছর আরও ৫০০ শয্যার অনুমোদন দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য অতিরিক্ত তিনটি তলা ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে প্রায় ২০০ প্রাপ্তবয়স্ক ও ১০০ শিশুর চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। একপর্যায়ে হাসপাতালটিতে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৩১৪ ছাড়িয়ে যায়। তাদের মধ্যে ২১৮ জন ডেঙ্গু এবং ৫৩ জন হাম আক্রান্ত ছিলেন।

রাজধানীর বাইরেও ডেঙ্গুর চাপ রয়েছে। ঝালকাঠিতে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১ হাজার ৬৬৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। ১০০ শয্যার জেলা হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগীর জন্য অস্থায়ী শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৫০ শয্যার নতুন ভবনের নির্মাণকাজও চলছে।

ডেঙ্গু রোগীদের বয়সভিত্তিক তথ্যেও তরুণদের আক্রান্ত হওয়ার হার উল্লেখযোগ্য। ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী ৮ হাজার ৭৫১ জন এবং ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৮ হাজার ৬৩১ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সীদের মধ্যে ভর্তি হয়েছেন ৮ হাজার ২২৪ জন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনের বেলায় এডিস মশার কামড় এবং বাইরে চলাচলের কারণে তরুণদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল ও নির্মাণকাজসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে দিনের বড় সময় বাইরে কাটানোর কারণে এ বয়সী মানুষের সংস্পর্শের সুযোগও বেশি থাকে।

মৃত্যুর পরিসংখ্যানে নারীদের অংশ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ১৭৮ জনের মধ্যে ৯২ জন নারী ও ৮৫ জন পুরুষ ছিলেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালে দেরিতে পৌঁছানো, গর্ভাবস্থা, রক্তক্ষরণ, রক্তস্বল্পতা ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতা নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

রোগীর চাপ মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও জনবল বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০০টির বেশি শয্যা বাড়ানো হয়েছে। গত দুই থেকে তিন দিনে সেখানে ১৩ জন অতিরিক্ত চিকিৎসক যুক্ত করা হয়েছে। আরও নার্স ও অন্যান্য কর্মী দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়তে পারে—এমন পূর্বাভাস আগে থেকেই ছিল। সে অনুযায়ী হাসপাতালগুলোকে অতিরিক্ত জায়গা প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। রোগীর চাপ আরও বাড়লে মাঠ হাসপাতাল বা অস্থায়ী হাসপাতাল চালুর বিষয় বিবেচনা করা হতে পারে।

হাম নিয়ন্ত্রণেও দ্রুত রোগী শনাক্ত করা, আক্রান্তদের পৃথক রাখা, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু মোকাবিলায় এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডেঙ্গু হাম

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!