যুক্তরাষ্ট্র   বুধবার ২৯ জুলাই ২০২৬,১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

এবার ব্যাংকের কাউন্টারে নয়, সিদ্ধান্ত নেবে AI

মো: নাঈমুর রহমান

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৮ PM

এবার ব্যাংকের কাউন্টারে নয়, সিদ্ধান্ত নেবে AI

ব্যাংকিং খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) ধীরে ধীরে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসছে। গ্রাহকসেবা থেকে শুরু করে জালিয়াতি শনাক্তকরণ, ঋণ অনুমোদন, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই AI-এর ব্যবহার বাড়ছে।

একসময় ব্যাংকের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ছিল এটিএম। ১৯৬৭ সালে যুক্তরাজ্যের বার্কলেস ব্যাংকে প্রথম এটিএম চালুর পর মানুষ ব্যাংক কাউন্টারের বাইরে টাকা উত্তোলনের নতুন অভিজ্ঞতা পেয়েছিল। পাঁচ দশকের বেশি সময় পর ব্যাংকিং খাত আবারও এমন এক পরিবর্তনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে যন্ত্র শুধু কাজ করবে না, বরং শিখবে, বিশ্লেষণ করবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সহায়তা করবে।

বিশ্বজুড়ে বড় বড় ব্যাংক এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করে অর্থ লেনদেনের নিরাপত্তা বাড়ানো, গ্রাহকদের দ্রুত সেবা দেওয়া এবং পরিচালন ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছে। বাংলাদেশেও এই পরিবর্তনের ধারা শুরু হয়েছে। যদিও দেশের ব্যাংকিং খাতে AI ব্যবহারের মাত্রা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে এর বিস্তার দ্রুত বাড়ছে।

ব্যাংকের নেপথ্যের কর্মী হয়ে উঠছে AI

বর্তমানে অনেক গ্রাহক ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহার করার সময় ভার্চুয়াল সহকারী বা চ্যাটবটের মাধ্যমে সেবা নিচ্ছেন। এসব সিস্টেম গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ছাড়াও সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত, তথ্য বিশ্লেষণ, নথি যাচাই এবং বিভিন্ন আর্থিক পরামর্শ দিতে সক্ষম হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক ইতোমধ্যে AI ব্যবহার করে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ ব্যাংক জানিয়েছে, তাদের AI-ভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতারণার কারণে গ্রাহকদের ক্ষতি কমাতে সহায়তা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জেপি মরগানও কর্মীদের সহায়তায় নিজস্ব AI প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশেও মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপগুলোতে AI প্রযুক্তির ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়ছে।

অ্যাপভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে বাড়ছে AI-এর ভূমিকা

বর্তমান সময়ে ব্যাংকের সঙ্গে গ্রাহকের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে উঠেছে মোবাইল অ্যাপ। বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গ্রাহকের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের NexusPay, ইসলামী ব্যাংকের CellFin, ব্র্যাক ব্যাংকের Astha, সিটি ব্যাংকের Citytouch এবং প্রাইম ব্যাংকের MyPrime-এর মতো অ্যাপগুলো গ্রাহকদের দৈনন্দিন ব্যাংকিং সহজ করছে।

এই সুবিধার পেছনে কাজ করছে বিভিন্ন ধরনের AI প্রযুক্তি। গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, ছবি বিশ্লেষণ, ব্যক্তিগত আর্থিক আচরণ বোঝা, উপযুক্ত সেবা প্রস্তাব করা এবং সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করার মতো কাজ করছে এসব প্রযুক্তি।

একটি বিল পরিশোধের রিমাইন্ডার থেকে শুরু করে অস্বাভাবিক খরচের বিষয়ে সতর্কতা—সবকিছুতেই ব্যবহার হচ্ছে পূর্বাভাসভিত্তিক প্রযুক্তি।

সহকারী থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী AI

বিশ্বের ব্যাংকিং খাতে এখন নতুন ধারণা হচ্ছে ‘এজেন্টিক AI’। এই প্রযুক্তি শুধু কর্মীদের সহায়তা করবে না, বরং নির্দিষ্ট কিছু কাজ নিজেরাই সম্পন্ন করতে পারবে।

যেমন—নতুন গ্রাহকের আবেদন যাচাই, পরিচয় নিশ্চিতকরণ, প্রয়োজনীয় নথি পরীক্ষা এবং নিয়ম মেনে অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।

তবে AI-এর এই স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। কোনো অ্যালগরিদম ভুল সিদ্ধান্ত নিলে তার দায় কে নেবে, অথবা গ্রাহককে সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা কীভাবে দেওয়া হবে—এসব বিষয় নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে AI-এর সম্ভাবনা

বাংলাদেশের জন্য AI প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুযোগ হতে পারে ঋণ ব্যবস্থাপনায়। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীর পর্যাপ্ত ঋণ ইতিহাস না থাকায় তারা ব্যাংকিং সুবিধা থেকে পিছিয়ে থাকেন।

AI-ভিত্তিক ক্রেডিট স্কোরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বিকল্প তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব গ্রাহকের ঋণযোগ্যতা যাচাই করা সম্ভব হতে পারে।

এ ছাড়া ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণা শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। AI কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লাখ লাখ লেনদেন বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক কার্যক্রম শনাক্ত করতে পারে।

KYC যাচাই, ঋণের আবেদন প্রক্রিয়া, নথি ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ম মেনে চলার রিপোর্ট তৈরির মতো কাজেও AI ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব।

AI ব্যবহারে প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক

আর্থিক খাতে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত AI ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

এই নীতিমালায় AI ব্যবহারের নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা, নৈতিক ব্যবহার এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজস্ব বড় ভাষাভিত্তিক AI মডেল তৈরির বিষয়ও বিবেচনা করছে, যাতে সংবেদনশীল তথ্য বিদেশি সার্ভারে পাঠানোর ঝুঁকি কমে।

AI ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক পূর্বাভাস, ঋণ ঝুঁকি বিশ্লেষণ, বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং গ্রাহক অভিযোগ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রযুক্তির সঙ্গে বদলাবে ব্যাংকের কর্মসংস্থানও

AI ব্যবহারের ফলে ব্যাংকিং খাতে কাজের ধরনেও পরিবর্তন আসবে। বিশ্বের কিছু দেশে দ্রুত অটোমেশনের কারণে কিছু প্রচলিত চাকরি কমেছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, AI মানুষের বিকল্প নয়; বরং মানুষের কাজকে আরও কার্যকর করার একটি মাধ্যম। এজন্য ব্যাংক কর্মীদের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।

ব্যাংকিং খাত যেহেতু মানুষের বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল, তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।

ভবিষ্যতের ব্যাংকিং হবে আরও স্মার্ট

ভবিষ্যতে একজন গ্রাহক রাতের যেকোনো সময়ে ঋণের আবেদন করে কয়েক মিনিটের মধ্যে সিদ্ধান্ত পেতে পারেন। ব্যাংকিং অ্যাপ গ্রাহকের খরচের অভ্যাস বিশ্লেষণ করে আর্থিক পরিকল্পনার পরামর্শ দিতে পারে। এমনকি কোনো প্রতারণামূলক কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই AI তা শনাক্ত করতে পারে।

এই পরিবর্তন হঠাৎ করে দৃশ্যমান হবে না। বরং ধীরে ধীরে এমন একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৈরি হবে, যেখানে সেবা হবে দ্রুত, ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং নিরাপদ।

এটিএম যেমন একসময় ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে বদলে দিয়েছিল, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও আগামী দিনের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!