যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,২ আশ্বিন ১৪৩৩

টেলিগ্রামে কড়া, এক্সে নমনীয়: শিশু নিপীড়নমূলক কনটেন্টে অ্যাপলের নীতি নিয়ে প্রশ্ন

সবুজ নিশান ডেস্ক

সবুজ নিশান ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩৮ PM ৪৯

ছবি: সংগৃহীত

শিশু যৌন নিপীড়নমূলক ও বেআইনি কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে টেলিগ্রাম ও এক্সের প্রতি অ্যাপলের আচরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই ধরনের গুরুতর অভিযোগের পরও একটি প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অন্যটির ক্ষেত্রে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ ঘিরেই প্রযুক্তি অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি শিশু যৌন নিপীড়নমূলক বেআইনি কনটেন্ট শনাক্ত হওয়ার পর টেলিগ্রামকে সাময়িকভাবে অ্যাপ স্টোর থেকে সরিয়ে দেয় অ্যাপল। সংশ্লিষ্ট কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার পর অ্যাপটি আবার অ্যাপ স্টোরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তবে একই সময়ে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চ্যাটবট গ্রক ব্যবহার করে শিশুদের যৌনভাবে বিকৃত ছবি ও ডিপফেক তৈরির অভিযোগ ওঠার পরও অ্যাপল এক্সকে অ্যাপ স্টোর থেকে সরায়নি।

প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম দ্য ভার্জের এক প্রতিবেদনের পর অ্যাপলের এই ভিন্ন আচরণ নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।

টেলিগ্রামকে কেন সরানো হয়েছিল

সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী বহুল ব্যবহৃত মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রাম অল্প সময়ের জন্য অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরে অনুপস্থিত হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলে পরে অ্যাপল জানায়, শিশু যৌন নিপীড়নমূলক বেআইনি কনটেন্ট পাওয়ার কারণেই অ্যাপটি সাময়িকভাবে সরানো হয়েছিল।

টেলিগ্রাম সংশ্লিষ্ট কনটেন্ট অপসারণের পর অ্যাপটি আবার অ্যাপ স্টোরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তবে ঘটনাটি অ্যাপলের কনটেন্ট নীতিমালা কতটা সমভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।

টেলিগ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলক শিথিল কনটেন্ট মডারেশন নীতির জন্য সমালোচিত। বিভিন্ন দেশে প্ল্যাটফর্মটির বিরুদ্ধে অবৈধ কনটেন্ট, সন্ত্রাসবাদ ও শিশু নিপীড়নমূলক উপাদান নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এক্সের ক্ষেত্রে কেন ভিন্ন অবস্থান?

টেলিগ্রামের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নিলেও এক্সের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ ওঠার পর অ্যাপলের পদক্ষেপ ছিল ভিন্ন। এক্সের এআই চ্যাটবট গ্রক ব্যবহার করে শিশুদের বিকৃত ও যৌন উদ্দীপক ছবি তৈরির অভিযোগ সামনে আসার পর বিভিন্ন মহল থেকে অ্যাপ স্টোর থেকে এক্স সরিয়ে দেওয়ার দাবি ওঠে।

যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন জায়গায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ ও সমালোচনা দেখা দেয়। এমনকি এক্স ও এর এআই প্রতিষ্ঠান এক্সএআইয়ের বিরুদ্ধে সম্মতি ছাড়া ডিপফেক ছবি তৈরির অভিযোগে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়।

তবু অ্যাপল এক্সকে অ্যাপ স্টোর থেকে সরানোর পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যোগাযোগ করে কনটেন্ট মডারেশন ব্যবস্থা উন্নত করার ওপর জোর দেয় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

মার্কিন সিনেটরদের কাছে পাঠানো অ্যাপলের একটি চিঠির বরাত দিয়ে এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, গ্রক-সংক্রান্ত ডিপফেক বিতর্কের পর অ্যাপল নিজ উদ্যোগে এক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। প্রতিষ্ঠানটির কাছে কনটেন্ট মডারেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনাও চাওয়া হয়।

পরবর্তীতে অ্যাপল জানায়, এক্স তাদের নীতিমালা লঙ্ঘনের বেশ কিছু বিষয় সমাধান করেছে। তবে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না এলে অ্যাপ স্টোর থেকে এক্স সরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানানো হয়েছিল।

রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন

অ্যাপলের এই ভিন্ন আচরণের পেছনে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক বাস্তবতা কাজ করছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও প্রযুক্তি বিষয়ক অধ্যাপক অনুপম চন্দর মনে করেন, বড় কোনো প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে কঠোর কনটেন্ট নীতি প্রয়োগ করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও বিবেচনা করতে হয়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এক্সের রাজনৈতিক প্রভাব ও সমর্থনের পরিধি টেলিগ্রামের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে এক্সকে অ্যাপ স্টোর থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নিলে অ্যাপলকে বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হতে পারে।

অধ্যাপক চন্দরের মতে, এমন সিদ্ধান্ত অ্যাপলের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন ছাড়া নেওয়া কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে ইলন মাস্কের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াও অ্যাপলকে বিবেচনায় নিতে পারে।

তবে অ্যাপল আনুষ্ঠানিকভাবে টেলিগ্রাম ও এক্সের ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণের পেছনে রাজনৈতিক কোনো কারণ থাকার কথা স্বীকার করেনি।

টেলিগ্রামকে ঘিরে আন্তর্জাতিক চাপ

টেলিগ্রামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের সরকারের পদক্ষেপ নতুন নয়। অতীতে সন্ত্রাসবাদ, উসকানিমূলক বক্তব্য, অবৈধ কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট নিয়ে প্ল্যাটফর্মটির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালে ফ্রান্সে টেলিগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী পাভেল দুরভ গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্ল্যাটফর্মটির কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা আরও তীব্র হয়। ফরাসি কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে অবৈধ কার্যক্রম ও শিশু নিপীড়নমূলক কনটেন্ট সংক্রান্ত অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের চাপের মধ্যে টেলিগ্রাম তাদের কনটেন্ট মডারেশন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেয়। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যবহারকারীদের তথ্যের বিষয়ে আদালতের নির্দেশে সাড়া দেওয়া এবং বেআইনি কনটেন্ট শনাক্তে নজরদারি বাড়ানোর মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

মাস্ক-অ্যাপল দ্বন্দ্বের পুরোনো ইতিহাস

অ্যাপল ও ইলন মাস্কের সম্পর্কেও অতীতে প্রকাশ্য টানাপোড়েন দেখা গেছে। ২০২২ সালে মাস্ক টুইটার অধিগ্রহণের পর অ্যাপলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন, প্রতিষ্ঠানটি অ্যাপ স্টোরে টুইটারের কার্যক্রম সীমিত করার চেষ্টা করছে।

পরে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুকের সঙ্গে মাস্কের বৈঠকের মাধ্যমে সেই বিরোধ অনেকটা প্রশমিত হয়। দুই পক্ষের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের বিষয়টি তখন প্রযুক্তি অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল।

বর্তমান এক্স ও গ্রক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে সেই পুরোনো সম্পর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

টেলিগ্রামের দাবি, অ্যাপল যোগাযোগ করেনি

টেলিগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা পাভেল দুরভের দাবি, অ্যাপ স্টোর থেকে প্ল্যাটফর্মটি সরানোর আগে অ্যাপল তাদের সঙ্গে যথাযথভাবে যোগাযোগ করেনি।

অন্যদিকে এক্সের ক্ষেত্রে অ্যাপল সরাসরি যোগাযোগ করে কনটেন্ট মডারেশন উন্নত করার সুযোগ দিয়েছে—এমন তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে দুটি প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে অ্যাপলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অ্যাপল অবশ্য অ্যাপ স্টোরে কোনো অ্যাপ রাখা বা সরিয়ে নেওয়ার অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশ করে না।

কনটেন্ট নীতির নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন

অ্যাপ স্টোরে শিশু নিপীড়নমূলক কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি অ্যাপলের ঘোষিত নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু একই ধরনের অভিযোগে ভিন্ন প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে ভিন্ন মাত্রার পদক্ষেপ নেওয়া হলে সেই নীতির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

টেলিগ্রামকে দ্রুত সরিয়ে আবার ফিরিয়ে আনা এবং এক্সের ক্ষেত্রে সরাসরি অপসারণের পরিবর্তে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া—এই দুই ঘটনার পার্থক্যই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

তবে অ্যাপলের সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনাই একমাত্র কারণ—এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই। তাই বিষয়টি আপাতত নীতি প্রয়োগের সামঞ্জস্য, প্রযুক্তি কোম্পানির ক্ষমতা এবং বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রতি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের আচরণ নিয়ে একটি বিতর্ক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে—শিশুদের সুরক্ষা ও বেআইনি কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে অ্যাপ স্টোরের নীতিমালা কি সব প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে? নাকি প্ল্যাটফর্মের আকার, রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যবসায়িক গুরুত্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো না কোনোভাবে প্রভাব ফেলছে?

অ্যাপল টেলিগ্রাম এক্স ইলন মাস্ক শিশু নিপীড়নমূলক কনটেন্ট অ্যাপ স্টোর

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!