যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,২ আশ্বিন ১৪৩৩

এআই যদি কাজই করে, তাহলে চাকরিদাতার আপনাকে কেন দরকার?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২০ PM | সর্বশেষ আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০৫ PM ৪৯
এআই যদি কাজই করে, তাহলে চাকরিদাতার আপনাকে কেন দরকার?

ছবি:সংগৃহীত

চাকরির ইন্টারভিউতে এখন এমন প্রশ্ন আসা অস্বাভাবিক নয়—“এই কাজ তো এআই দিয়েই করা যায়, তাহলে আপনাকে নিয়োগ দেব কেন?” কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের কারণে বিশেষ করে নতুন গ্র্যাজুয়েটদের সামনে প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে একজন তরুণের হাতে থাকতে পারে ডিগ্রি, ইন্টার্নশিপের অভিজ্ঞতা এবং সুন্দর একটি প্রফেশনাল প্রোফাইল। কিন্তু চাকরির বাজারে প্রবেশের সময় তার প্রতিযোগিতা এখন শুধু অন্য প্রার্থীর সঙ্গে নয়, এআইনির্ভর প্রযুক্তির সঙ্গেও।

এআই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রতিবেদন লিখতে পারে, প্রেজেন্টেশনের কাঠামো তৈরি করতে পারে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কোড লিখতে পারে কিংবা নতুন কোনো বিষয়ের প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে। তাহলে একজন নতুন গ্র্যাজুয়েটের আলাদা মূল্য কোথায়?

প্রথমেই একটি বিষয় মেনে নেওয়া দরকার—কাজের কিছু অংশ এআই মানুষের তুলনায় দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে করতে পারবে। এটিকে শুধুই হুমকি হিসেবে দেখলে চলবে না।

গ্রাফিক ডিজাইনের প্রাথমিক খসড়া, কোনো প্রতিবেদনের প্রথম সংস্করণ, বড় ডেটাসেটের সারাংশ কিংবা গবেষণার প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহে এআই অনেক সময় মানুষের সময় বাঁচাতে পারে।

কিন্তু এআই দিয়ে কাজ করানো আর কাজের উদ্দেশ্য বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া এক বিষয় নয়।

একটি প্রতিবেদন তৈরি করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো—কোন তথ্য রাখা উচিত, কোনটি বাদ দেওয়া দরকার এবং নির্দিষ্ট পাঠকের জন্য প্রতিবেদনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই মানুষের বিচারবোধ, অভিজ্ঞতা ও চিন্তাশক্তির প্রয়োজন হয়।

 

 

 

চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে একটি সাধারণ প্রবণতা হলো সিভিতে অনেক সফটওয়্যারের নাম যোগ করা। মাইক্রোসফট এক্সেল, পাওয়ারপয়েন্ট, ক্যানভা, বিভিন্ন এআই টুল, কমিউনিকেশন বা লিডারশিপ—সবই তালিকায় থাকে।

কিন্তু নিয়োগকর্তা যদি প্রশ্ন করেন, “আপনি এক্সেল ব্যবহার করে বাস্তবে কোন সমস্যার সমাধান করেছেন?”, তখন শুধু সফটওয়্যারটির নাম জানা যথেষ্ট হবে না।

আসল দক্ষতা হলো কোনো টুল ব্যবহার করে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারা।

অর্থাৎ, টুল শেখা দক্ষতার শুরু; সেটিকে কাজে লাগিয়ে ফলাফল তৈরি করাই প্রকৃত দক্ষতা

 

ধরা যাক, কোনো প্রতিষ্ঠানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য একজন নারী কৃষকের গল্প তৈরি করতে হবে। এআইকে নির্দেশ দিলে সে মুহূর্তেই একটি সুন্দর ও অনুপ্রেরণামূলক গল্প লিখে দিতে পারে।

কিন্তু একজন প্রতিবেদক বা কনটেন্ট নির্মাতা যদি ওই কৃষকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন, তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা শোনেন এবং বাস্তব সমস্যাগুলো বোঝেন, তাহলে গল্পটি অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য ও মানবিক হতে পারে।

হয়তো জানা গেল, ওই নারী একসময় সমবায় সভায় কথা বলতে সংকোচ করতেন। নিজের আয় নিয়েও পরিবারের সামনে কথা বলতে দ্বিধা ছিল। পরে তিনিই অন্য নারীদের নিয়ে সঞ্চয় কার্যক্রম শুরু করেছেন।

এ ধরনের বাস্তব অভিজ্ঞতা শুধু তথ্য নয়; এর সঙ্গে মানুষের অনুভূতি, প্রেক্ষাপট ও পরিবর্তনের গল্প জড়িয়ে থাকে। এ জায়গায় মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং মনোযোগ দিয়ে শোনার ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এআইয়ের যুগে সব উত্তর জানা হয়তো আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ থাকবে না। বরং সঠিক প্রশ্ন করতে পারা আরও বড় দক্ষতা হয়ে উঠতে পারে।

একজন নতুন কর্মীর মনে প্রশ্ন থাকতে পারে—

  • এই প্রকল্পটি কেন করা হচ্ছে?
  • নির্দিষ্ট মানুষগুলো এটি গ্রহণ করছে না কেন?
  • ব্যবহৃত তথ্যের উৎস কী?
  • প্রকল্পের প্রকৃত উপকারভোগী কারা?
  • আমরা যে বার্তা দিচ্ছি, সংশ্লিষ্ট মানুষ বিষয়টিকে একইভাবে দেখছেন কি না?
  • এই প্রচারণার আসল লক্ষ্য শ্রোতা কারা?

কোনো কাজ হাতে পাওয়ার পর শুধু “ঠিক আছে” বলার পরিবর্তে যদি প্রশ্ন করা যায়, “এই কাজটির মূল উদ্দেশ্য কী?”, তাহলে কাজটির মান অনেকটাই বদলে যেতে পারে।

সিভি তৈরি, প্রেজেন্টেশনের কাঠামো, গবেষণার প্রাথমিক ধাপ, বানান-ব্যাকরণ সংশোধন কিংবা নতুন কোনো ধারণা বোঝার ক্ষেত্রে এআই কার্যকর সহায়ক হতে পারে।

তবে এআইয়ের দেওয়া প্রতিটি তথ্য নির্ভুল—এমন ধারণা করা ঠিক নয়। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাই করতে হবে। প্রয়োজন হলে মূল উৎস দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে হবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের বিচারবুদ্ধি কাজে লাগাতে হবে।

ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে এমন মানুষের চাহিদা বাড়তে পারে, যারা শুধু এআই ব্যবহার করতে পারেন না; বরং এআইয়ের তৈরি ফলাফল বিশ্লেষণ করে সঠিক সিদ্ধান্তও নিতে পারেন।

নতুন চাকরিতে শুরুতেই বড় দায়িত্ব পাওয়া যাবে—এমনটা সবসময় হয় না। কখনো মিটিংয়ের নোট তৈরি করতে হতে পারে, ডেটা সাজাতে হতে পারে, অসংখ্য ফোন করতে হতে পারে কিংবা একটি প্রেজেন্টেশনের ছোটখাটো ভুল ঠিক করতে হতে পারে।

এসব কাজকে ছোট মনে না করে শেখার সুযোগ হিসেবে নেওয়া উচিত।

ক্যারিয়ার অনেক সময় এক লাফে তৈরি হয় না। বরং প্রতিদিনের ছোট কাজ ঠিকভাবে করার অভ্যাস থেকেই পেশাগত দক্ষতা তৈরি হয়।

একদিন ভালো একটি ইমেইল লেখা, অন্যদিন কার্যকরভাবে একটি মিটিং পরিচালনা করা কিংবা কঠিন কোনো সহকর্মীর সঙ্গে পেশাদারভাবে কাজ করতে পারা—এসব অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে একজন কর্মীকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

নতুন গ্র্যাজুয়েটদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হতে পারে কয়েকটি মানবিক দক্ষতা—কৌতূহল, ভালো প্রশ্ন করার ক্ষমতা, বিচারবোধ, যোগাযোগ দক্ষতা, শেখার আগ্রহ এবং অন্য মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার সক্ষমতা।

এর সঙ্গে যোগ করতে হবে নিজের চিন্তা নিজে করার অভ্যাস।

এআই আপনার হয়ে লিখতে পারে, প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে পারে কিংবা গবেষণার বড় একটি অংশ সহজ করে দিতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিয়োগকর্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি থেকেই যাবে—

“আপনি প্রতিষ্ঠানে কী অতিরিক্ত মূল্য যোগ করতে পারবেন?”

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই হতে পারে নতুন গ্র্যাজুয়েটদের সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি।

এআইকে চাকরির বাজারের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখলে ভয় তৈরি হবে। বরং এটিকে এমন একটি প্রযুক্তি হিসেবে দেখা দরকার, যা একজন কর্মীর কাজকে দ্রুত ও কার্যকর করতে পারে।

ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবেন তারাই, যারা প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি নিজেদের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন।

তাই এআই আপনার জায়গা নেবে কি না—এই ভয় নিয়ে বসে থাকার চেয়ে এখন থেকেই প্রশ্ন করুন: এআইকে ব্যবহার করে আমি কীভাবে আরও ভালো কাজ করতে পারি এবং নিজের আলাদা মূল্য কীভাবে তৈরি করতে পারি?

এআই ও চাকরি ভবিষ্যতের চাকরি ক্যারিয়ার টিপস

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!