যুক্তরাষ্ট্র   রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,৪ আশ্বিন ১৪৩৩

রাজস্ব আদায় কমায় ভ্যাট নীতিতে পরিবর্তনের উদ্যোগ, চাপে ব্যবসায়ীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৪ PM
রাজস্ব আদায় কমায় ভ্যাট নীতিতে পরিবর্তনের উদ্যোগ, চাপে ব্যবসায়ীরা

ছবি: সংগৃহীত

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতে ভ্যাট আদায় কমে যাওয়ার পর ভ্যাট রিটার্ন জমা ও পরিশোধের পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমাতে বাজেটে প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও নতুন ব্যবস্থায় আদায় কমে যাওয়ায় আগের নিয়মে ফেরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এদিকে খুচরা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্যাকেজ ভ্যাট চালুর পরিকল্পনাও করছে এনবিআর।

এনবিআর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ভ্যাট আদায় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। জুলাইয়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। আগের বছরের একই মাসে আদায় হয়েছিল ১১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। আগস্টে সাময়িক হিসাবে আদায় হয়েছে ৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের আগস্টে ছিল ১১ হাজার ৮১ কোটি টাকা।

রাজস্ব আদায়ের সামগ্রিক পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের তথ্য এনবিআর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। এনবিআরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আয়কর আইন ও ভ্যাট রিটার্ন জমার নিয়ম পরিবর্তনের সঙ্গে সমন্বয়ের কারণে তথ্য প্রকাশে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের জটিলতা কমাতে তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। কিন্তু প্রথম দুই মাসে ভ্যাট আদায় কমে যাওয়ার পর এনবিআরের ভ্যাট নীতি শাখা অর্থ মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি নিয়ে চিঠি দিয়েছে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। সেপ্টেম্বরের পর বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে বলে এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সম্ভাব্য একটি ব্যবস্থায় তিন মাস পরপর রিটার্ন জমার সুযোগ বহাল রেখে প্রতি মাসে ভ্যাটের অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হতে পারে।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিনের মতে, মাসিক রিটার্ন ব্যবস্থা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য জটিলতা বাড়াবে। অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রেও অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এখনো প্রস্তুত নন বলে তিনি দাবি করেন।

গুলিস্তানের পোশাক ব্যবসায়ী তুহিন ফিরোজীও মাসিক রিটার্ন দাখিলকে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে ভ্যাটের কাজ করতে সময় বের করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যাওয়া ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।

এনবিআর খুচরা পর্যায়ের দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনাও করছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ইউনিয়ন পর্যায়ের দোকানের জন্য মাসে ৫০০ টাকা, উপজেলা পর্যায়ে ১ হাজার টাকা এবং জেলা সদর ও জেলা পৌর এলাকায় ২ হাজার টাকা ন্যূনতম ভ্যাট নির্ধারণের পরিকল্পনার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও এই অর্থ পরিশোধের সুযোগ রাখার কথা রয়েছে।

বিভিন্ন উপজেলায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরির কাজ চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে কোন প্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থার আওতায় আসবে, তা নির্ধারণের কথা রয়েছে।

তবে ব্যবসায়ী নেতারা এমন উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিনের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দার মধ্যে একের পর এক কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।

করবিদ স্নেহাশীষ বড়ুয়া ন্যূনতম ভ্যাট চালুর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন ভ্যাটের বাড়তি বোঝা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে পড়ে কি না, তা নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, ভ্যাটের অজুহাতে বিক্রেতারা পণ্যের দাম বাড়ালে ভোক্তাদের সুরক্ষায় কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

আইন অনুযায়ী, বার্ষিক বিক্রয় বা লেনদেন ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সীমার মধ্যে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য হয়। ৫০ লাখ টাকার কম বার্ষিক বিক্রি বা লেনদেনের ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয়।

এদিকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এনবিআর কর ফাঁকি রোধ, বকেয়া কর আদায় ও করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর মতো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে ভ্যাট আদায় কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে নীতি পরিবর্তনের উদ্যোগ এবং ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ—দুই বিষয়ই এখন আলোচনায় রয়েছে।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!