ছবি : সংগৃহীত
প্রতিদিনের খাবার নিরাপদ ভেবে গ্রহণ করছেন কোটি মানুষ। কিন্তু রান্নার তেল, চিনি, তরল ও গুঁড়া দুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে পাওয়া যাচ্ছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক। দেশের কয়েকটি পৃথক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এই তথ্য।
গবেষকদের মতে, খাদ্যের মাধ্যমে প্রতিদিন অজান্তেই মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে অসংখ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা। দীর্ঘমেয়াদে এসব কণা জনস্বাস্থ্যের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় প্রতিটি নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ব্র্যান্ডেড বোতলজাত তেলে গড়ে ৪৮ হাজার ৬৭টি এবং খোলা তেলে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি কণা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ খোলা তেলে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি।
বিশ্বখ্যাত Journal of Food Composition and Analysis-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় সয়াবিন তেলে ছয় ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, প্লাস্টিকের পাত্রের ব্যবহার, খোলা অবস্থায় খাদ্য বিক্রি, সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং উৎপাদন ও পরিবহনের বিভিন্ন ধাপ থেকে এসব কণা খাদ্যে মিশতে পারে।
চিনিতেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক
একই জার্নালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া সাত ধরনের ব্র্যান্ডেড ও খোলা চিনির নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, ৯৫ শতাংশ নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে।
গবেষণায় প্রতি কেজি চিনিতে ২১০ থেকে ৫০৮টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। ব্র্যান্ডেড চিনিতে গড়ে ৩২২টি এবং খোলা চিনিতে গড়ে ৪০৩টি কণা পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, উৎপাদন, পরিশোধন, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন ধাপ থেকে চিনিতে এসব কণা যুক্ত হতে পারে।
দুধেও পাওয়া গেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা কাঁচা দুধ, বাজারজাত তরল ও গুঁড়া দুধ এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যের ৪১টি নমুনা পরীক্ষা করেন।
গবেষণায় প্রতিটি নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। প্রতি ১০০ মিলিলিটার ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ৬টি, কাঁচা দুধে ৯৩ দশমিক ৩৯টি এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে ৭০ দশমিক ৮০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
গবেষকদের ধারণা, দুধ সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেটজাত করার বিভিন্ন ধাপে এসব কণা খাদ্যে মিশতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
গবেষণাগুলোতে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পিইটি, নাইলন, পিভিসি, পলিইউরেথেন ও টেফলনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, এসব কণার বড় অংশ ফাইবারজাতীয়, যা কৃত্রিম তন্তুর পোশাক, প্লাস্টিকের সরঞ্জাম, ফিল্টার, পাইপ, প্যাকেজিং উপকরণ কিংবা বাতাসের মাধ্যমেও খাদ্যে প্রবেশ করতে পারে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শুধু সয়াবিন তেলের মাধ্যমেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা প্রবেশ করতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে দুধ গ্রহণের কারণে এই ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারণ হিসেবে প্রমাণিত না হলেও দীর্ঘমেয়াদে শরীরে এসব কণা জমে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, যেসব খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, সেগুলো নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার অনুমোদন নিয়েই বাজারে আসে। তাই মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কোনো দুর্বলতা রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা খাদ্য উৎপাদন, প্যাকেজিং ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় আরও কঠোর নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!