ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে প্রতিবছর কয়েক হাজার শ্রেণির পণ্য আমদানি হলেও মোট আমদানির বড় একটি অংশ আসে অল্প কয়েকটি পণ্য থেকে। শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি ও অবকাঠামো নির্মাণের উপকরণই এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করে আছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের বিভিন্ন কাস্টমস স্টেশন দিয়ে মোট প্রায় ১৫ কোটি ৮৬ লাখ টন পণ্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষ ১০টি পণ্যের পরিমাণ প্রায় ৯ কোটি ৯৮ লাখ টন। অর্থাৎ মোট আমদানির ওজনের প্রায় ৬৩ শতাংশই এসেছে এই ১০ ধরনের পণ্য থেকে।
এবারের তালিকায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো কয়লার উত্থান। দীর্ঘ ২৫ বছর পর প্রথমবারের মতো সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকারকে পেছনে ফেলে শীর্ষ আমদানি পণ্যের অবস্থান দখল করেছে কয়লা।
শীর্ষে কয়লা
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ টন কয়লা আমদানি হয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই জ্বালানির চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আমদানি করা কয়লার প্রায় ৭৫ শতাংশ ছয়টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে শিল্পকারখানার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও কয়লার ব্যবহার বাড়ায় এটি দেশের সবচেয়ে বেশি আমদানি হওয়া পণ্যে পরিণত হয়েছে।
দ্বিতীয় ক্লিংকার
দীর্ঘদিনের শীর্ষস্থান হারিয়ে এবার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ক্লিংকার। গত অর্থবছরে প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ টন ক্লিংকার আমদানি হয়েছে।
সিমেন্ট তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকারের পাশাপাশি এই শিল্পে স্ল্যাগ, চুনাপাথর ও ফ্লাই অ্যাশও ব্যবহার করা হয়। এই চার ধরনের কাঁচামালই শীর্ষ ১০ আমদানি পণ্যের তালিকায় রয়েছে।
স্ল্যাগ আমদানি হয়েছে প্রায় ৮৩ লাখ টন। প্রায় ৬০ লাখ টন চুনাপাথর এবং ৫০ লাখ টন ফ্লাই অ্যাশ আমদানি হয়েছে। চার ধরনের কাঁচামাল মিলিয়ে সিমেন্টশিল্পের জন্য প্রায় ৩ কোটি ৮৫ লাখ টন পণ্য এসেছে।
তৃতীয় চূর্ণ পাথর
শীর্ষ আমদানি পণ্যের তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চূর্ণ পাথর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এর আমদানি ছিল প্রায় ১ কোটি ৬৮ লাখ টন।
সড়ক, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে চূর্ণ পাথর ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। একই কারণে বোল্ডার পাথরের আমদানিও উল্লেখযোগ্য। গত অর্থবছরে প্রায় ৫৫ লাখ টন বোল্ডার পাথর এসেছে, যা তালিকায় অষ্টম অবস্থানে রয়েছে।
গম একমাত্র খাদ্যপণ্য
শীর্ষ ১০ আমদানি পণ্যের মধ্যে খাদ্যপণ্য হিসেবে রয়েছে শুধু গম। গত অর্থবছরে দেশে প্রায় ৭৪ লাখ ৩৪ হাজার টন গম আমদানি করা হয়েছে।
দেশের মোট গমের চাহিদার বড় অংশ আমদানিনির্ভর। স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে চাহিদার আনুমানিক ১৫ শতাংশ পূরণ হওয়ায় বাকি অংশের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়।
সপ্তম অবস্থানে লোহার স্ক্র্যাপ
ইস্পাতশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল পুরোনো লোহার স্ক্র্যাপ রয়েছে সপ্তম অবস্থানে। গত অর্থবছরে প্রায় ৫৭ লাখ টন স্ক্র্যাপ আমদানি করা হয়েছে।
দেশের ইস্পাত কারখানাগুলোতে এসব স্ক্র্যাপ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে বিলেট তৈরি করা হয়। পরে সেই বিলেট ব্যবহার করে রডসহ বিভিন্ন ধরনের ইস্পাতপণ্য উৎপাদন করা হয়।
নবম এলএনজি
জ্বালানি পণ্যের মধ্যে কয়লার পর শীর্ষ তালিকায় রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি। গত অর্থবছরে এর আমদানি ছিল প্রায় ৫১ লাখ টন।
দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থাকায় কয়েক বছর ধরেই এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। আমদানি করা এলএনজি পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
শীর্ষ ১০ পণ্যের তালিকা
২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ অনুযায়ী শীর্ষ ১০ পণ্য হলো—
১. কয়লা — প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ টন
২. ক্লিংকার — প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ টন
৩. চূর্ণ পাথর — প্রায় ১ কোটি ৬৮ লাখ টন
৪. স্ল্যাগ — প্রায় ৮৩ লাখ টন
৫. গম — প্রায় ৭৪ লাখ ৩৪ হাজার টন
৬. চুনাপাথর — প্রায় ৬০ লাখ টন
৭. লোহার স্ক্র্যাপ — প্রায় ৫৭ লাখ টন
৮. বোল্ডার পাথর — প্রায় ৫৫ লাখ টন
৯. এলএনজি — প্রায় ৫১ লাখ টন
১০. ফ্লাই অ্যাশ — প্রায় ৫০ লাখ টন
সামগ্রিক চিত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশের আমদানি তালিকায় সরাসরি ভোগ্যপণ্যের চেয়ে শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি এবং নির্মাণসামগ্রীর প্রাধান্য বেশি। বিশেষ করে সিমেন্ট ও ইস্পাত খাতের কাঁচামাল এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি মিলিয়ে আমদানির বড় অংশ দেশের শিল্প ও অবকাঠামোগত কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে।
শীর্ষ ১০ আমদানি পণ্য ২০২৫-২৬ অর্থবছর
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!