যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,২ আশ্বিন ১৪৩৩

বেসরকারি হাতে জ্বালানি তেল আমদানি: বিপিসির ফার্নেস অয়েল অভিজ্ঞতায় বড় ঝুঁকির আশঙ্কা

সাইফুল ইসলাম জয়

সাইফুল ইসলাম জয়

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৩৩ PM ৪৬
বেসরকারি হাতে জ্বালানি তেল আমদানি: বিপিসির ফার্নেস অয়েল অভিজ্ঞতায় বড় ঝুঁকির আশঙ্কা

ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, ডলারের সংকট এবং কম লাভের বাজারে সরবরাহের অনাগ্রহ—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির নতুন উদ্যোগ নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানিও ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও ফার্নেস অয়েল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাত করার সুযোগ পেতে পারে। সরকারের দাবি, এর মাধ্যমে সরবরাহের উৎস বাড়বে এবং বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।

তবে বিপিসির আশঙ্কা, ব্যবসায় লাভ কমে গেলে কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে বেসরকারি আমদানিকারকরা আমদানি কমিয়ে দিতে পারেন। একইভাবে ডলারের সংকট দেখা দিলে এলসি খোলা ও তেল আমদানিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তখন দেশের জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখার বাড়তি দায়িত্ব আবার সরকারের ওপরই পড়বে।

ফার্নেস অয়েল থেকে যে শিক্ষা

বাংলাদেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির অভিজ্ঞতা পুরোপুরি নতুন নয়। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজেদের ব্যবহারের জন্য অনুমোদন নিয়ে ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে পারে।

বিপিসির অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বদলালে এসব প্রতিষ্ঠানের আমদানি সিদ্ধান্তও পরিবর্তিত হতে পারে। কখনও নিজেদের মাধ্যমে আমদানি করা লাভজনক হওয়ায় তারা সরাসরি তেল আনে, আবার পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে বিপিসির সরবরাহের ওপর নির্ভর করে।

২০২৫ সালে ফার্নেস অয়েল আমদানির সার্ভিস চার্জ কমানোর পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিপিসির কাছ থেকে তেল নেওয়ার আগ্রহ দেখালে সরকারি সংস্থাটি সেই অনুযায়ী আমদানি ও মজুদের প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু পরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আবার নিজেদের ব্যবস্থায় তেল আমদানি শুরু করে।

ফলে বিপিসির পরিকল্পিত মজুদ ও প্রকৃত চাহিদার মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়। এক পর্যায়ে সংস্থার মজুদাগার প্রায় পূর্ণ হয়ে যায় এবং নতুন জাহাজ থেকে তেল খালাসের সময় নিয়েও চাপ তৈরি হয়। জাহাজ বন্দরে অপেক্ষা করলে ডেমারেজ বা অতিরিক্ত খরচের ঝুঁকিও থাকে।

এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন জাতীয় পর্যায়ের আমদানি পরিকল্পনা ও মজুদ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজার ও ডলারের সংকট

বিপিসির অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ তেলের দাম বেড়ে যাওয়া। দাম বেশি হলে বেসরকারি আমদানিকারকরা লোকসানের আশঙ্কায় আমদানি কমিয়ে দিতে পারেন।

এর পাশাপাশি রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি। ২০২২ সালে ডলার সংকটের সময় কয়েকটি বেসরকারি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নতুন এলসি খুলতে ও ঋণ পরিশোধ করতে সমস্যায় পড়েছিল। প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি আমদানি করতে না পারায় কিছু প্রতিষ্ঠানের মজুদও কমে যায়।

বিপিসির আশঙ্কা, ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি যদি বড় পরিসরে তৈরি হয়, তাহলে বেসরকারি আমদানিকারকদের সিদ্ধান্ত দেশের সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে বেসরকারি আমদানি সবসময় বেশি ব্যয়বহুল হবে—এমন ধারণাও ঠিক নয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে কিছু বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নিজেদের ব্যবস্থায় যে ফার্নেস অয়েল আমদানি করেছিল, তার গড় ব্যয় বিপিসির মাধ্যমে সরবরাহ করা তেলের তুলনায় কম ছিল।

অর্থাৎ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কম দামে জ্বালানি পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

সরকার পুরো বাজার ছাড়ছে না

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার বিপিসিকে সরিয়ে দিয়ে পুরো জ্বালানি বাজার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে না।

বরং সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি কোম্পানি—দুই পক্ষকেই বাজারে রেখে প্রতিযোগিতা তৈরির চিন্তা করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থাতেও রাষ্ট্রীয়ভাবে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত থাকবে।

তবে বেসরকারি কোম্পানি সংকটের সময়ে সরবরাহ না করলে তাদের ওপর কী ধরনের বাধ্যবাধকতা থাকবে, সেটি এখনও স্পষ্ট নয়। মন্ত্রী জানিয়েছেন, এ বিষয়ে নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে এবং সেটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

প্রত্যন্ত এলাকায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ

বিপিসির আশঙ্কার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বড় শিল্পাঞ্চলের মতো জায়গায় জ্বালানি পরিবহনে তুলনামূলক কম খরচ হয় এবং বাজারও বড়। কিন্তু দুর্গম বা দূরবর্তী অঞ্চলে তেল পাঠাতে পরিবহন ব্যয় বেশি।

সরকারি ব্যবস্থায় বিপিসি ও রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন কোম্পানিগুলোকে সারাদেশে জ্বালানি সরবরাহের দায়িত্ব পালন করতে হয়। বেসরকারি কোম্পানিগুলো লাভের ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনা করলে তারা কম লাভজনক এলাকায় সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।

এ কারণে বেসরকারি আমদানিকারকদের জন্য সারাদেশে নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ বাধ্যতামূলক করা হবে কি না, সেটিও নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

মজুদ ও বাজার নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে ব্যবসায়ীরা বেশি লাভের আশায় জ্বালানি মজুদ করে রাখতে পারেন। এমন প্রবণতা দেখা দিলে বাজারে সাময়িক সংকট তৈরি হতে পারে এবং ভোক্তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ বাড়তে পারে।

আরেকটি ঝুঁকি হলো বাজারের বড় অংশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া। একাধিক কোম্পানি বাজারে থাকলেই যে কার্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, তা নিশ্চিত নয়।

যদি অল্প কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান আমদানি ও সরবরাহের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে তারা বাজারে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি না থাকলে সরকারের জন্য বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হতে পারে।

বিপিসির সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারের বড় অংশ দখল করলে বিপিসির ব্যবসার পরিমাণ কমতে পারে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় আমদানি অবকাঠামো, মজুদাগার, পরিবহন ব্যবস্থা ও জনবল ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আসতে পারে।

কিন্তু বড় কোনো আন্তর্জাতিক সংকট দেখা দিলে যদি বেসরকারি কোম্পানিগুলো আমদানি কমিয়ে দেয়, তখন দ্রুত ঘাটতি পূরণের দায়িত্ব আবার বিপিসির ওপরই পড়তে পারে।

এখানেই বিপিসির মূল উদ্বেগ। বাজারের স্বাভাবিক সময়ে সরকারি সক্ষমতা কমে গেলে সংকটের সময় অল্প সময়ে বড় পরিমাণ তেল আমদানি ও বিতরণ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।

রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েলের ব্যবসার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও তাই প্রশ্ন উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে কী করা দরকার

জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর আগে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমের মতে, সংকটের সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা, মূল্য তদারকি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আগে নির্ধারণ করা জরুরি।

তার মতে, জ্বালানি কৌশলগত পণ্য হওয়ায় শুধু বাজারের ওপর নির্ভর করে সরবরাহ নিশ্চিত করা ঝুঁকিপূর্ণ। কয়েকটি বড় কোম্পানি বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিলে অলিগোপলির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতুও মনে করেন, বেসরকারি আমদানির মাধ্যমে শুরুতে সরবরাহের উৎস বাড়তে পারে। তবে বাজারের বড় অংশ যদি অল্প কয়েকটি কোম্পানির হাতে চলে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে মূল্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় তাদের প্রভাব বাড়তে পারে।

তার মতে, শুধু একাধিক কোম্পানিকে লাইসেন্স দিলেই প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত হয় না। কার্যকর প্রতিযোগিতার জন্য বাজার নজরদারি ও সরকারের নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা শক্তিশালী করাও প্রয়োজন।

বসুন্ধরার আবেদন ঘিরে নতুন আলোচনা

বেসরকারি খাতে সরাসরি পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানির একটি আবেদনের পর।

প্রতিষ্ঠানটি ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও ফার্নেস অয়েল সরাসরি আমদানি করে বাজারজাত করার অনুমতি চেয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সর্বোচ্চ পরিমাণ ধরে বছরে প্রায় ৩৩ লাখ ৫০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির সুযোগ চাওয়া হয়েছে।

দেশের মোট বার্ষিক জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৭৪ লাখ টন হওয়ায় প্রস্তাবিত পরিমাণটি মোট চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ।

আবেদনটি পর্যালোচনার জন্য বিপিসি ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। আমদানির পরিমাণ, আইনগত বিষয়, সংরক্ষণ ও বিতরণ সক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন কোম্পানির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়গুলো পর্যালোচনার আওতায় রাখা হয়েছে।

সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে পাশাপাশি রেখে জ্বালানি তেলের বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি করা গেলে আমদানির উৎস বাড়তে পারে, ব্যবসায়িক দক্ষতা বাড়তে পারে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কম দামে জ্বালানি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কিন্তু এর পাশাপাশি কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর নীতিমালায় পরিষ্কার করা জরুরি—

  • আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে বেসরকারি কোম্পানিকে আমদানি চালিয়ে যেতে হবে কি না।
  • ডলার সংকটের সময় জ্বালানি সরবরাহ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।
  • প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের দায়িত্ব কার থাকবে।
  • সংকটের সময় বেসরকারি কোম্পানি মজুদ করে রাখলে সরকার কী ব্যবস্থা নিতে পারবে।
  • বাজারের বড় অংশ কয়েকটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে প্রতিযোগিতা কীভাবে বজায় রাখা হবে।
  • বেসরকারি আমদানির কারণে বিপিসির সক্ষমতা কমে গেলে জাতীয় সংকটে জরুরি সরবরাহ কে নিশ্চিত করবে।
  • রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধন ও অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে বেসরকারি আমদানির সমন্বয় কীভাবে হবে।

শেষ পর্যন্ত বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার সাফল্য নির্ভর করবে শুধু কতটি কোম্পানি তেল আমদানি করতে পারবে তার ওপর নয়। বরং সংকটের সময় সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা রাখা এবং রাষ্ট্রীয় জ্বালানি নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য সরকার কতটা শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে—সেটিই হবে মূল বিষয়।

বিপিসি জ্বালানি তেল ফার্নেস অয়েল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বসুন্ধরা অয়েল জ্বালানি মন্ত্রণালয়

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!