জাতীয় প্রকৌশলী সম্মেলনে বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের মেধা, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট মো. রুহুল কবির রিজভী। তাঁর মতে, একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতেই দায়িত্ব বণ্টন হওয়া উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের পেশাগত যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া এবং চাকরির সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসা উদ্বেগের বিষয়।
বৃহস্পতিবার ‘প্রকৌশলী অধিকার দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত ‘জাতীয় প্রকৌশলী সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন রিজভী। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি)-এর সহযোগিতায় প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলন এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
রিজভী বলেন, কোনো দেশের উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের দক্ষতা কাজে লাগানোর বিকল্প নেই। পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উন্নয়নের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি চীনের অগ্রগতির পেছনে প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের অবদানের কথাও উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশে মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, প্রকৌশলীদের পদ ও দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মেধার পরিবর্তে জনতার চাপ বা প্রভাবনির্ভর কোনো ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে তা শুধু পেশাজীবীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করবে না, বরং দেশের উন্নয়ন ব্যবস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
দেশের বড় প্রকল্পগুলোতে প্রকৌশলীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে রিজভী তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণে বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের ভূমিকার উদাহরণ দেন। তাঁর বক্তব্য, বড় ও জটিল জাতীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশের প্রকৌশলীদের সক্ষমতা রয়েছে। তাই তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় আরও ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ ও সুযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি। শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় উল্লেখ করে রিজভী বলেন, গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রকৌশলীদের মেধার মূল্যায়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং গবেষণাভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে যেতে পারবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (এ্যাব) আহ্বায়ক প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম তুহিন প্রকৌশলীদের পেশাগত মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে শুধু আলোচনা নয়, সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান বের করা প্রয়োজন। বিসিএসে প্রকৌশলীদের জন্য নির্ধারিত পদ কমে যাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও আইইবির প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু) বলেন, গত এক বছরে প্রকৌশলীদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হলেও তাঁদের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। বর্তমান বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবটিক্স, বিগ ডাটা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের এসব ক্ষেত্রে দক্ষ করে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
দেশের বড় উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা, নকশা, বাস্তবায়ন ও তদারকিতে যোগ্য প্রকৌশলীদের সম্পৃক্ত করলে প্রকল্পের মান, সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেন রিয়াজুল ইসলাম। একই সঙ্গে যথাযথ মূল্যায়ন, কর্মসংস্থান, গবেষণা ও নেতৃত্বের সুযোগের অভাবে মেধাবী প্রকৌশলীদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে দেশে যোগ্যতাভিত্তিক কর্মপরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের সভাপতি প্রকৌশলী এম ওয়ালি উল্লাহ। তিনি দাবি করেন, সহকারী প্রকৌশলী পদে ৬৭ শতাংশ নিয়োগের বিধান থাকলেও বাস্তবে ৩৩ শতাংশ নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। অবশিষ্ট পদগুলো পদোন্নতি অথবা অতিরিক্ত দায়িত্বের মাধ্যমে পূরণ করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের ১০ম গ্রেডের উপসহকারী প্রকৌশলী পদে আবেদন করার সুযোগ না থাকার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর দাবি, অন্যান্য কিছু পদে আবেদন করার সুযোগ থাকলেও প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রে এমন বিধিনিষেধ বৈষম্যমূলক। পাশাপাশি বিসিএসে প্রকৌশলীদের জন্য নির্ধারিত পদ কমে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মেধা, যোগ্যতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
সম্মেলনে আইইবির ভাইস প্রেসিডেন্ট (একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক) প্রকৌশলী খান মনজুর মোরশেদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (প্রশাসন ও অর্থ) প্রকৌশলী এ টি এম তানবীর-উল হাসান (তমাল), সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান, সম্মানী সম্পাদক (ঢাকা কেন্দ্র) প্রকৌশলী কে এম আসাদুজ্জামান, ভাইস চেয়ারম্যান (একাডেমিক ও এইচআরডি) প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন, কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য প্রকৌশলী রবিউল আলম উজ্জ্বলসহ সংশ্লিষ্টরা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) প্রকৌশলী মুহাম্মদ আহসানুল রাসেল। এতে আইইবির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য এবং বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
ইঞ্জিনিয়ার প্রকৌশলী আইইবি রিজভী
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!