ছবি: সংগৃহীত
সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে দুই দফায় মারধরের পর মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। একই সঙ্গে পুলিশ উদ্ধার করার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর ওপর আবার হামলার ঘটনা কীভাবে ঘটল, তা তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকেলে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ দাবি জানায় এনসিপি। দলটি বলেছে, কারও বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত ও বিচারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজ উদ্যোগে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার রাখে না।
গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দেবহাটা উপজেলায় শামীমের কয়েকটি অডিও কথোপকথন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা তৈরি হলে একদল লোক তাঁকে মারধর করে। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।
সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবারও তাঁর ওপর হামলা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে পুলিশ পাহারায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই রাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার এই বিবরণ স্থানীয় পুলিশ ও একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে।
এনসিপির বিবৃতিতে বলা হয়, প্রথমবার হামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শামীমকে উদ্ধার করলেও পরবর্তী সময়ে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসাধীন একজন ব্যক্তির ওপর হাসপাতালে আবার হামলার সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কারও অবহেলা বা যোগসাজশ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের দাবি জানিয়েছে দলটি।
বিবৃতিতে হামলায় নেতৃত্ব ও সহযোগিতার অভিযোগে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এনসিপি বলেছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে হামলাকারী এবং সম্ভাব্য উসকানিদাতাদের ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে।
নিহত শামীমের পরিবার জানিয়েছে, তিনি মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন এবং তাঁর চিকিৎসা চলছিল। এ অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওর সত্যতা ও বক্তব্যের প্রেক্ষাপট যাচাইয়ের পাশাপাশি তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থাও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এনসিপি। পরিবারের এই দাবির কথাও একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
দলটির মতে, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলেও বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে শাস্তি দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষার পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এ ঘটনায় চারটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে এনসিপি। এর মধ্যে রয়েছে দুই দফার হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, হাসপাতালে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা তদন্ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অডিও ও সম্ভাব্য উসকানির উৎস যাচাই এবং নিহতের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
পাশাপাশি নিহতের পরিবার যেন প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা পায় এবং ভয়ভীতি ছাড়া বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে, সে ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছে দলটি।
এনসিপি জানিয়েছে, কোনো অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। এ ধরনের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে নাগরিক নিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!