প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ডালিয়ান থেকে বেইজিং পর্যন্ত ট্রেনযাত্রা, আমার কাছে তাঁর সাম্প্রতিক চীন সফরের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অংশ বলে মনে হয়েছে। কারণ একটি দেশের উন্নয়নকে বোঝার জন্য শুধু রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক, চুক্তি স্বাক্ষর বা বিনিয়োগ সম্মেলনে অংশগ্রহণই যথেষ্ট নয়। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে থাকে তার গ্রাম, শহর, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিল্পাঞ্চল, কৃষি, জনবসতি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র পরিকল্পনার মধ্যে।
আমার নিজেরও কয়েকবার চীন সফরের সুযোগ হয়েছে। বিভিন্ন প্রদেশে সীমিত সময়ের মধ্যে ভ্রমণ করেছি। তবে সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা ছিল গুয়াংজু থেকে সাংহাই পর্যন্ত প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ হাই-স্পিড ট্রেনযাত্রা। প্রায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার সেই যাত্রায় আমি যেন একটি দেশের উন্নয়নের নীরব ইতিহাস চোখের সামনে দেখতে পেয়েছিলাম।
ট্রেনের জানালার বাইরে যতদূর চোখ যায়, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, সুপরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল এবং আধুনিক আবাসিক নগরী। কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসতি নয়। বরং অসংখ্য গ্রামীণ পরিবারকে পরিকল্পিতভাবে আধুনিক বহুতল আবাসনে স্থানান্তর করা হয়েছে। কোথাও ১০০টি, কোথাও তারও অধিক বেশি ভবন একই নকশা, একই রং এবং একই স্থাপত্যিক দর্শনে নির্মিত। পুরো একটি অঞ্চলকে দেখলে মনে হয়, এটি কোনো প্রকল্প নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার বাস্তব রূপ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা কৃষিজমিকে রক্ষা করেছে। বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই কৃষিজমির ওপর বসতি বিস্তার দেখি। কিন্তু চীন উলটো পথ বেছে নিয়েছে। মানুষকে উলম্বভাবে আবাসনের ব্যবস্থা করে কৃষিজমিকে উৎপাদনের জন্য সংরক্ষণ করেছে। উন্নয়ন ও খাদ্যনিরাপত্তার এই সমন্বয়ই তাদের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি।
আরও একটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। চীনের ট্রেন স্টেশনগুলো। আমাদের দেশে রেলস্টেশনকে এখনো মূলত যাতায়াতের একটি কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়। অথচ চীনের অনেক স্টেশন এতটাই আধুনিক, সুবিশাল এবং প্রযুক্তিনির্ভর যে প্রথম দেখায় সেগুলোকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বলেই মনে হয়। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রী ধারণক্ষমতা, বাণিজ্যিক সুবিধা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরিচালনাগত দক্ষতার বিচারে এগুলো আমাদের দেশের বিমানবন্দরগুলোর চেয়েও উন্নত।
তখন উপলব্ধি করেছি, চীন শুধু ট্রেন নির্মাণ করেনি, তারা একটা রেলভিত্তিক অর্থনৈতিক সভ্যতা গড়ে তুলেছে।
বর্তমানে চীনের হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক বিশ্বের বৃহত্তম। প্রায় ৫০ হাজার কিলোমিটারের বেশি উচ্চগতির রেললাইন দেশটির অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। একটি শিল্পাঞ্চল, একটি বন্দর, একটি বিশ্ববিদ্যালয় শহর কিংবা একটি কৃষি অঞ্চলকে তারা বিচ্ছিন্নভাবে দেখেনি। সবকিছুকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে।
কিন্তু শুধু চীন নয়, বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোর দিকে তাকালেও একই চিত্র দেখা যায়।
যুক্তরাজ্যে রেলওয়ে শুধু পরিবহন নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তির একটি অংশ। লন্ডনে বসবাস না করেও মানুষ ম্যানচেস্টার, বার্মিংহাম, লিডস কিংবা লিভারপুল থেকে প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াত করতে পারে। ফলে উন্নয়ন একটি শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
সিঙ্গাপুর আরও একটি অনন্য উদাহরণ। দেশটির আয়তন ছোট হলেও তারা গণপরিবহণকে রাষ্ট্রপরিকল্পনার কেন্দ্রে রেখেছে। এমআরটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানকে একই পরিকল্পনার মধ্যে আনা হয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত গাড়ির উপর নির্ভরতা কমেছে এবং নগর ব্যবস্থাপনা কার্যকর হয়েছে।
মালয়েশিয়াও একই পথ অনুসরণ করেছে। কুয়ালালামপুরকে কেন্দ্র করে দ্রুতগতির রেল, কমিউটার ট্রেন এবং আঞ্চলিক সংযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন শহরকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে রাজধানীর ওপর চাপ কমেছে এবং আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এখান থেকে কী শিখতে পারে?
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা অবকাঠামোর ঘাটতি নয়, বরং ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন। দেশের প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাবসা, শিল্প এবং কর্মসংস্থানের বড়ো অংশ রাজধানীকেন্দ্রিক। ফলে ঢাকা আজ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এবং চাপপূর্ণ নগরীতে পরিণত হয়েছে।
আমরা প্রায়ই ঢাকার চাপ কমানোর কথা বলি। কিন্তু বাস্তবে ঢাকার বিকল্প তৈরি করার মতো পরিকল্পনা খুব কম দেখা যায়।
আমার মতে, বাংলাদেশের জন্য এখন একটি ৫০ বছর মেয়াদি জাতীয় যোগাযোগ ও নগরায়ণ মাস্টারপ্ল্যান প্রয়োজন।
প্রথম ধাপে ঢাকা-চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক করিডোরকে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা যেতে পারে। এর সঙ্গে কুমিল্লা, ফেনী, নরসিংদী এবং নারায়ণগঞ্জকে যুক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপে ঢাকা-গাজীপুর-টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ করিডোরকে দ্রুতগতির রেল ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।
তৃতীয় ধাপে ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-খুলনা এবং ঢাকা-সিলেট করিডোরকে একটি জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংযুক্ত করতে হবে।
এই নেটওয়ার্ক বাস্তবায়িত হলে একজন মানুষ টাঙ্গাইল, কুমিল্লা বা ময়মনসিংহে বসবাস করেও এক ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারবেন। ফলে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রয়োজন কমে যাবে। আবাসন খরচ কমবে, যানজট কমবে এবং রাজধানীর ওপর জনসংখ্যার চাপও হ্রাস পাবে।
এর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণও জরুরি। সব বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, করপোরেট সদর দপ্তর এবং প্রশাসনিক কাঠামো ঢাকায় কেন্দ্রীভূত রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।
চীন সফর নিয়ে আমার আরও দুটি বিশেষ প্রত্যাশা রয়েছে।
প্রথমত, বাংলাদেশের চামড়া শিল্পকে চীনের বাজারের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা। বাংলাদেশের চামড়া শিল্প বিশ্ববাজারে আরও বড়ো অবস্থান নিতে পারে, যদি সঠিক প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং বাজার প্রবেশ নিশ্চিত করা যায়।
দ্বিতীয়ত, চীনা ঋণ ও বিনিয়োগ গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা। উন্নয়নের নামে শুধু ঋণ গ্রহণ কোনো সাফল্য নয়। প্রতিটি প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় অবকাঠামো থাকবে, কিন্তু তার বোঝা বহন করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
আমার কাছে চীনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা, সেতু কিংবা রেললাইন নির্মাণ নয়। উন্নয়ন মানে একটি জাতীয় স্বপ্ন, একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সেই পরিকল্পনার প্রতি অবিচল প্রতিশ্রুতি।
অনেক সময় একটি দীর্ঘ ট্রেনযাত্রা একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকের চেয়েও বেশি শিক্ষা দেয়। কারণ সেখানে একটি দেশের প্রকৃত চেহারা, তার উন্নয়নের গল্প এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
আমি আশা করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ট্রেনযাত্রা কেবল একটি সফরসূচির অংশ হয়ে থাকবে না; বরং বাংলাদেশের আগামী ২০, ৩০ এবং ৫০ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে নতুনভাবে ভাবার একটি অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে। যদি আমরা উন্নয়নের প্রকল্প নয়, উন্নয়নের দর্শনকে গ্রহণ করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশও একদিন পরিকল্পিত, বিকেন্দ্রীভূত এবং টেকসই উন্নয়নের একটি সফল মডেলে পরিণত হতে পারবে।
লেখক: কাউন্সিল মেম্বার, ঢাকা সেন্টার, The Institution of Engineers, Bangladesh (IEB)
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!