যুক্তরাষ্ট্র   মঙ্গলবার ২৮ জুলাই ২০২৬,১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

বেলুচিস্তান: আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা ও দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ভূরাজনীতি

পপি দেবী থাপা

পপি দেবী থাপা

প্রকাশিত: ২১ জুলাই ২০২৬, ০৬:০১ PM

৬২
বেলুচিস্তান: আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা ও দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ভূরাজনীতি

ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এর প্রতীকী চিত্র।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বেলুচিস্তান আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি দাবিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে, পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ বেলুচিস্তান সত্যিই স্বাধীন হয়েছে কি?

‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ নামে প্রকাশিত একটি বিবৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিবৃতিতে দাবি করা হয়, বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আরও বলা হয়, অঞ্চলটির প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ স্বাধীনতাকামীদের হাতে, গঠন করা হয়েছে নতুন প্রশাসন। নেওয়া হয়েছে নিজস্ব জাতীয় পতাকা, সংগীত ও মুদ্রা চালুর উদ্যোগ।

এই দাবি মুহূর্তেই আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখন পর্যন্ত বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে কার্যকরভাবে বিচ্ছিন্ন বা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা রাষ্ট্রও এই দাবিকে স্বীকৃতি দেয়নি। তাহলে বিষয়টি আলোচনায় এভাবে উঠে এলো কেন।

বেলুচিস্তানের সমস্যা কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত এই প্রদেশটি আয়তনের দিক থেকে দেশটির সবচেয়ে বড় অঞ্চল। পাকিস্তানের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৪ শতাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত হলেও এখানে বসবাস করে দেশটির মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ মানুষ। এই অঞ্চলের রয়েছে আলাদা জাতিগত পরিচয়, ভাষা ও সংস্কৃতি। বেলুচ জনগোষ্ঠী বহু শতাব্দী ধরে এই এলাকায় বসবাস করছে। তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ- কেন্দ্রীয় সরকার তাদের রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং নিজস্ব সম্পদের ওপর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ দেয়নি।

১৯৪৮ সালে কালাত রাজ্য পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে অসন্তোষ ও বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়। এরপর কয়েক দশক ধরে বালোচ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বিভিন্ন রূপে চলমান রয়েছে। বেলুচ আন্দোলনের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক ন্যায্যতা এবং স্থানীয় জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা। বেলুচিস্তান প্রাকৃতিক সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। রয়েছে বিপুল গ্যাস, কয়লা, তামা, সোনা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ। বিশেষ করে সাইন্দাক ও রেকো ডিকের মতো খনিজ অঞ্চলগুলো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্র।

কিন্তু বেলুচ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের অভিযোগ, এসব সম্পদের প্রকৃত সুবিধা স্থানীয় মানুষ পাচ্ছে না। তাদের দাবি, সম্পদ উত্তোলন হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রতিফলন খুব কম। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব এবং উন্নয়নের ঘাটতি দীর্ঘদিনের ক্ষোভকে আরও গভীর করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার দাবি করে আসছে, বেলুচিস্তানের উন্নয়নে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক মনোযোগ কেড়েছে মানবাধিকার পরিস্থিতি। গত দুই দশকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বেলুচিস্তানে জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক কর্মী ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বানও জানানো হয়েছে।

বেলুচিস্তান প্রশ্নকে আঞ্চলিক সংকট থেকে বৈশ্বিক আলোচনায় নিয়ে এসেছে এর ভূরাজনৈতিক অবস্থান। পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমে আরব সাগর তীরবর্তী এই অঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের কাছাকাছি অবস্থানের কারণেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গোয়াদর বন্দরকে কেন্দ্র করে বেলুচিস্তান আজ দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলে পরিণত হয়েছে।

এই গুরুত্ব আরও বেড়েছে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ–এর অন্যতম প্রধান প্রকল্প হিসেবে সিপিইসি পশ্চিম চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলকে গোয়াদর বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। পাকিস্তানের দৃষ্টিতে এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং অবকাঠামো উন্নয়নের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। একই সঙ্গে চীনের জন্য এটি ভারত মহাসাগরে প্রবেশ, জ্বালানি পরিবহনের বিকল্প রুট এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।

বেলুচ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ, গওয়াদর ও সিপিইসি-কে ঘিরে বিপুল বিনিয়োগ হলেও স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান, ভূমির অধিকার, মৎস্যসম্পদে প্রবেশ এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ এখনও সীমিত। তাদের মতে, স্থানীয় জনগণের মতামত ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা কমানোর পরিবর্তে নতুন অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে।

বেলুচিস্তানের গুরুত্ব শুধু পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বেলুচিস্তান ইস্যু ভারতের জন্যও একটি জটিল কূটনৈতিক প্রশ্ন। ভারত অতীতে বেলুচিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে সরাসরি স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন করেনি। কারণ, বেলুচিস্তানকে স্বীকৃতি দেওয়া পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের অবস্থান নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। আবার চীন ও ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের চাবাহার বন্দর প্রকল্প এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে নয়াদিল্লিকে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিতে হচ্ছে। পাকিস্তানের অভিযোগ, ভারত বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দেয়; ভারত অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

অন্যদিকে উল্লেখযোগ্য বেলুচ জনগোষ্ঠী বাস করে ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে। ফলে তেহরানের উদ্বেগ, বেলুচিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তঃসীমান্ত সশস্ত্র তৎপরতার ঝুঁকি নিয়ে। আফগানিস্তানের দীর্ঘ সীমান্তও অঞ্চলটিকে নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং অভিবাসনের দিক থেকে কৌশলগতভাবে করে তুলেছে গুরুত্বপূর্ণ।

আবার যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো একদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতা ও ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেয়, অন্যদিকে মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিও সমানভাবে তুলে ধরে। বেলুচিস্তানের সংঘাতে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে সৃষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্যও চ্যালেঞ্জ। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে পাকিস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা। তবে চীনের প্রভাব দুর্বল করার সুযোগ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনক। বেলুচিস্থান লিবারেশন আর্ সহ বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারি স্থাপনার বিরুদ্ধে সশস্ত্র কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হামলা, অপহরণ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হত্যা এবং পাল্টা সামরিক অভিযানের ঘটনা বেড়েছে। পাকিস্তানি বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে বালোচ আন্দোলনের সমর্থকেরা অভিযোগ করে আসছেন, এসব অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। তবে উভয় পক্ষের দাবির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

একটি অঞ্চল স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে শুধু ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর প্রশাসন, স্থায়ী ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং কূটনৈতিক সক্ষমতা। বর্তমান পরিস্থিতিতে বেলুচিস্তানের ক্ষেত্রে এসব উপাদান দেখা যাচ্ছে না। তাই বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণাকে এখনই পাকিস্তানের ভাঙনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বেলুচিস্তানের সংকটকে শুধু বিচ্ছিন্নতাবাদ বা নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতা। সামরিক অভিযান দিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সংলাপ, জনগণের আস্থা অর্জন এবং উন্নয়নের সুফল নিশ্চিত করা।

বেলুচিস্তান স্বাধীন হয়ে গেছে-এমন দাবি এখনো বাস্তবতার চেয়ে বেশি প্রচারণামূলক বক্তব্য। একদিকে রাষ্ট্রের ভৌগলিক অখণ্ডতা অন্যদিকে জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এই অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী সংকট যে পাকিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে, তা নিশ্চিত। কেননা বেলুচিস্তান শুধু পাকিস্তানের একটি প্রদেশ নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!