যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ৩১ জুলাই ২০২৬,১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

সবজির দামে আগুন: ক্রেতার নাভিশ্বাস, নেই স্বস্তির আভাস

সৌরভ আহসান রবিন

সৌরভ আহসান রবিন

প্রকাশিত: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৪ PM

৭৩
সবজির দামে আগুন: ক্রেতার নাভিশ্বাস, নেই স্বস্তির আভাস

ছবি: সংগৃহীত

দেশজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজির বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনে চরম চাপ সৃষ্টি করেছে। একের পর এক সবজির দাম বাড়তে থাকায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন বাজারে গিয়ে ক্রেতারা ফিরে আসছেন হতাশ হয়ে। যে সবজি একসময় স্বল্পমূল্যে কিনে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা যেত, এখন তা অনেকের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

সকালের বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন সবজির দোকানে ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও অধিকাংশ মানুষ দাম শুনে পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। কেউ এক কেজির পরিবর্তে আধা কেজি, আবার কেউ আধা কেজির পরিবর্তে মাত্র ২৫০ গ্রাম কিনে বাড়ি ফিরছেন। বিক্রেতাদের সঙ্গে দর-কষাকষি করেও তেমন কোনো লাভ হচ্ছে না।

সবজি বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে খুচরা বাজারে দাম কমিয়ে বিক্রি করার সুযোগ নেই। পরিবহন ব্যয়, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি কিংবা খরার কারণে উৎপাদন কমে যাওয়া, সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য—সব মিলিয়ে সবজির বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজার তদারকির অভাব এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, পর্যাপ্ত নজরদারি থাকলে এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে বাজারে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে দাম কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

মধ্যবিত্ত পরিবারের চাকরিজীবী মানুষদের অনেকেই বলছেন, মাসের শুরুতে যে বাজেট করা হয়, মাসের মাঝামাঝি এসে তা ভেঙে পড়ছে। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, শিক্ষা ও চিকিৎসা খরচের সঙ্গে এখন সবজির অতিরিক্ত দাম যোগ হওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার মাছ-মাংস তো দূরের কথা, সবজিও কম খাচ্ছে।

নিম্ন আয়ের মানুষের অবস্থা আরও করুণ। দিনমজুর, রিকশাচালক, শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিদিন যে আয় হয় তা দিয়ে পরিবারের মৌলিক চাহিদাই পূরণ করা যাচ্ছে না। অনেকেই অভিযোগ করেন, আগে যে টাকায় তিন-চার ধরনের সবজি কেনা যেত, এখন সেই টাকায় একটি সবজিও ঠিকমতো কেনা যায় না।

একজন গৃহিণী জানান, প্রতিদিন রান্নার আগে হিসাব করতে হচ্ছে কোন সবজি কিনলে কম খরচ হবে। সন্তানদের পুষ্টিকর খাবার দিতে না পারার কষ্টও বাড়ছে। অনেক পরিবার এখন ডাল ও আলুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে অতিরিক্ত খরচ যোগ হওয়ার ফলে খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তারা মনে করেন, শুধু অভিযান পরিচালনা নয়, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, দ্রুত পরিবহন এবং কার্যকর বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষকরাও বলছেন, তারা সব সময় ন্যায্য দাম পান না। অনেক সময় মাঠে কম দামে ফসল বিক্রি করতে হলেও শহরের বাজারে সেই একই পণ্য কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। এর মূল সুবিধা পান মধ্যস্বত্বভোগীরা। ফলে কৃষক ও ভোক্তা—উভয় পক্ষই ক্ষতির মুখে পড়েন।

বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার, উন্নত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে মূল্য অস্থিরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। পাশাপাশি বাজারে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও পরামর্শ দেন তারা।

সরকারি সংস্থাগুলোর নিয়মিত বাজার তদারকি এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত সময়ের মধ্যে বাজারে স্বস্তি ফিরবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজির দাম নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।

বর্তমান বাস্তবতায় সবজির মূল্যবৃদ্ধি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, পুষ্টি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য প্রতিদিনের বাজার এখন এক কঠিন সংগ্রামের নাম। বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের প্রধান পথ।
লেখক: কলামিস্ট

মূল্যবৃদ্ধি বাজার সরকার

১ মন্তব্য


Urmi Akter Mim

কথাগুলো বর্তমানে স্বল্প আয়ের সকল নাগরিকদের মনের লুকিয়ে থাকা অভিযোগ।এত সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ

৩১ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৬ PM