যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,২ আশ্বিন ১৪৩৩

চুলার আগুন থেকে শিল্পের চাকা: গ্যাস সংকটের দৃশ্য-অদৃশ্য মূল্য

পপি দেবী থাপা

পপি দেবী থাপা

প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৪:১৬ PM | সর্বশেষ আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২২ PM ১৭৯

ছবি: সবুজ নিশান

সকালের নাশতা তৈরির জন্য চুলায় হাঁড়ি বসিয়েছেন গৃহিণী। মিনিট পেরিয়ে ঘণ্টা গড়ালেও আগুন জ্বলছে না। কোথাও ক্ষীণ শিখা, কোথাও একেবারেই গ্যাস সরবরাহ নেই। অন্যদিকে একটি রপ্তানিমুখী কারখানায় উৎপাদন লাইন চালু হওয়ার কথা সকাল আটটায়। শ্রমিকরা উপস্থিত, কাঁচামাল প্রস্তুত, বিদেশি ক্রেতার চুক্তিবদ্ধ সময়সীমা ঘনিয়ে এসেছে কিন্তু পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় বয়লার চালু হচ্ছে না। ফলে উৎপাদন থেমে আছে। দুটি দৃশ্য আলাদা হলেও সংকট একটিই-গ্যাসের।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতে গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, নরসিংদী, চট্টগ্রামসহ শিল্পঘন এলাকায় দিনের পর দিন গ্যাসের নিম্নচাপ অথবা সম্পূর্ণ গ্যাসহীন পরিস্থিতির অভিযোগ উঠছে। শুধু রান্না বিলম্বিত হওয়া নয়, হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি এবং উৎপাদনমুখী শিল্প একই সঙ্গে এর ক্ষতিকর প্রভাব বহন করছে।

অনেক এলাকায় পরিবারগুলোকে রান্না করতে হচ্ছে গভীর রাত অথবা ভোরে। তখন কিছু সময়ের জন্য গ্যাসের চাপ থাকে। বাধ্য হয়ে বাড়ছে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার, অনেকে ঝুঁকছেন বৈদ্যুতিক চুলার দিকে। সেদিকেও যে খুব সুবিধা তা নয়, বিদ্যুৎ বিলের পরিমান বেশি! সবার পক্ষে তো বিকল্প গ্রহণ করা সম্ভব নয়। উপায়ন্তর না পেয়ে চড়া দামে খেতে হচ্ছে বাইরের খাবার। ব্যয় নিয়ে চাপে সবাই, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো রীতিমত সংকটে।

চুলায় গ্যাস না থাকলেও মাস শেষে নির্ধারিত গ্যাস বিল ঠিকই পরিশোধ করতে হচ্ছে। যে দেশে পাইপলাইনের গ্যাসের ওপর নির্ভর করে লক্ষ লক্ষ পরিবার তাদের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা করে, সেখানে এই অনিশ্চয়তা শুধু ভোগান্তি নয়, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মঘণ্টা এবং সামাজিক স্বাভাবিকতাকেও প্রভাবিত করে। সংকটের এই অভিঘাত কেবল রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ নয়। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, কাঁচ, স্টিল, সিমেন্ট, সার ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ অসংখ্য শিল্প সরাসরি গ্যাসনির্ভর। পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকলে বয়লার, ফার্নেস ও উৎপাদন লাইন স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব নয়। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, ব্যয় বাড়ে, নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি আদেশ সরবরাহে ঝুঁকি তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট গ্যাসের চাহিদা দৈনিক প্রায় ৩,৮০০ থেকে ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও বাস্তবে সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম। গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়া এবং আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ার পরিনতিতে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন আজ- জাতীয় সংকট। প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে বহু কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। অধিকাংশ গ্যাসনির্ভর শিল্প পরিচালিত হচ্ছে ৬০-৭০ শতাংশ সক্ষমতায়।

দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্ভর করে আরও কয়েক কোটি মানুষ। গ্যাস সংকটের কারণে যদি উৎপাদন কমে যায় বা রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা না যায়, এর প্রভাব শুধু কারখানার মালিকদের ওপরই নয়; শ্রমিকের আয়, ক্ষুদ্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ওপরও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। চুলার আগুন না জ্বলা যেমন একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনকে থামিয়ে দেয়, তেমনি শিল্পকারখানার বয়লার বন্ধ হওয়া একটি দেশের উৎপাদন, রপ্তানি ও অর্থনীতির গতিকেও ধীর করে।

সরকারের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের পেছনে একাধিক কারণ দেখিয়ে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্য ওঠানামা, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাস, আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে সাময়িক সরবরাহ ঘাটতি। সান্ত্বনার এটাই কী শেষ কথা! জানা সত্ত্বেও বিকল্প ব্যবস্থা কেন আগে করা হলো না। কারণগুলো অধিকাংশই নতুন নয়। যখন জানা ছিল দেশের বড় বড় গ্যাসক্ষেত্র ধীরে ধীরে পরিণত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে এবং উৎপাদন কমবে। এটাও স্পষ্ট যে শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে গ্যাসের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়বে। তাহলে এই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তুতি কি যথেষ্ট ছিল বলে মনে করেছেন কর্তৃপক্ষ?

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোতে উন্নয়নমূলক কূপ খননের গতি চাহিদার তুলনায় অনেক ধীর। যখন দেশীয় উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে, তখন অনুসন্ধান কার্যক্রম, গভীর কূপ খনন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে আরও জোর দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। বাস্তবে সেই অগ্রগতি প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি। বাংলাদেশ গভীর সমুদ্রে হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধানের নতুন সুযোগ পেলেও অফশোর ব্লকগুলোতে আন্তর্জাতিক কোম্পানির অংশগ্রহণ, জরিপ এবং অনুসন্ধান কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। নীতিগত সিদ্ধান্ত, দরপত্র প্রক্রিয়া, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং চুক্তি সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। তারপরও অগ্রগতি সন্তোষজনক একথাও বলা যাচ্ছে না।

গ্যাস সরবরাহে এলএনজির অংশ ক্রমেই বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে আমদানির বিকল্প নেই। যখন একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ে, তখন সেই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে শক্তিশালী অবকাঠামো, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ক্ষমতা, একাধিক সরবরাহ উৎস এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। সে প্রস্তুতি কি সময়মতো সম্পন্ন হয়েছে?

সাম্প্রতিক সময়ে একটি এফএসআরইউর রক্ষণাবেক্ষণের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার ঘটনা দেখিয়েছে যে, পুরো ব্যবস্থায় বিকল্প সক্ষমতা এখনো সীমিত। একটি অবকাঠামোগত সমস্যাই জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ সংকটের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি শুধু তাৎক্ষণিক কারিগরি সমস্যা নয়, জ্বালানি ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা কতটা শক্তিশালী, সেটাও বুঝিয়ে দিয়েছে।

নীতিগত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিকল্পনার সময়কাল। বিগত সময়ে যখন দেশীয় উৎপাদন কমার প্রবণতা স্পষ্ট ছিল, তখন নতুন অনুসন্ধান, কূপ খনন, অফশোর কার্যক্রম এবং বিকল্প সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অগ্রগতি কি হয়েছে? ঘোষণার সংখ্যা ও প্রকল্পের তালিকার বাইরে, বাস্তবে কতগুলো নতুন কূপ উৎপাদনে এসেছে, কত অতিরিক্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে এবং সেই বৃদ্ধি বর্তমান চাহিদার তুলনায় কতটা পর্যাপ্ত? বিষয়গুলোর স্পষ্ট উত্তর পেতে হবে- তাহলে আগামীর নিরাপত্তা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল বর্তমান সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা দিয়ে নয়, ভবিষ্যতের সংকট কতটা আগেভাগে অনুমান করে তার প্রস্তুতি কতটা নেওয়া হয়েছে- তার ওপরও নির্ভর করে। গ্যাস সংকট শুধু সরবরাহের হিসাব নয়; এটি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, অনুসন্ধান এবং নীতিগত প্রস্তুতিরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন মানে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, উৎপাদন ব্যাহত মানেই রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, আর রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পড়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান পর্যন্ত। প্রতিদিন কয়েকশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি নিয়ে চলা শিল্প ও অর্থনীতি গতি কমিয়ে দেয় হাজারো উৎপাদন লাইনের।

তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তার জানিয়েছেন, অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়নি। কোথাও উৎপাদন আংশিকভাবে সীমিত, কোথাও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তারা উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনলেও পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্যাস পাচ্ছেন না। বর্তমানে বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য ৩০ টাকা হলেও নতুন শিল্প সংযোগের ক্ষেত্রে তা ৪০ টাকা। একইভাবে নতুন ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য ৪২ টাকা। অর্থাৎ শিল্প খাত এখন একইসঙ্গে উচ্চ ব্যয় ও নিম্ন সরবরাহের দ্বৈত সংকটের মুখোমুখি, যা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি সক্ষমতা হ্রাস আর বিনিয়োগে সৃষ্টি করছে অনিশ্চয়তা। শিল্প সংগঠনগুলোর মতে, দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন, যা বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতার জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। বড় শিল্পই নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও এই সংকটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বেকারি, রেস্তোরাঁ, ডেইরি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, লন্ড্রি ও বিভিন্ন সেবা-খাত গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে উৎপাদন ও সেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ জানিয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি বড় অংশ গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের জন্যও একটি বড় প্রতিবন্ধক। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন শিল্প স্থাপনের আগে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহকে অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করে। গ্যাস সরবরাহ অনিশ্চিত থাকলে কমবে নতুন বিনিয়োগের গতি, শিল্প সম্প্রসারণ বিলম্বিত হওয়াসহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান সৃষ্টি । জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। যা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি।

উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের অতিরিক্ত ব্যয়, রপ্তানি বিলম্ব, যন্ত্রপাতির অদক্ষ ব্যবহার, শ্রমঘণ্টার অপচয় এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা- সব মিলিয়ে এর অর্থনৈতিক মূল্য নিঃসন্দেহে কয়েক হাজার কোটি টাকার সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব প্রকাশিত না হলেও, শিল্পখাতে প্রতিদিনের উৎপাদন ব্যাঘাত, বন্ধ হওয়া কলকারখানা আর গ্যাসের দাবিতে থালা, হারিকেন হাতি নিয়ে পথে নামা জনতার মিছিলই বলে দেয়- এর প্রভাব কোনোভাবেই সাময়িক বা তুচ্ছ নয়।

সমস্যা কেবল প্রযুক্তিগত বা সরবরাহগত বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে শিল্পনীতি, বিনিয়োগ নীতি, রপ্তানি সক্ষমতা সর্বোপরি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতি কি অনিবার্য ছিল, না কি সময়মতো যথাযথ পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নিলে এর তীব্রতা কমানো যেত? জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করছেন যে দেশের বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলো- বিশেষ করে তিতাস, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ, কৈলাশটিলা ও রশিদপুর ক্রমেই পরিণত গ্যাসক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদন ধীরে ধীরে কমবে। বাস্তবতা জানা থাকার পরও নতুন গ্যাসের উৎস খুঁজতে অনুসন্ধান কার্যক্রম কতটা গতি পেয়েছে? কয়েকটি নতুন কূপ থেকে যে পরিমাণ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে, তা বিদ্যমান ঘাটতি পূরণে যথেষ্ট নয়।

একইভাবে, বঙ্গোপসাগরের অফশোর সম্ভাবনাও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন ছিল দ্রুত দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ, সঠিক ও সুনির্ধারিত পরিকল্পনা, আকর্ষণীয় উৎপাদন-বণ্টন চুক্তি, আন্তর্জাতিক কোম্পানির অংশগ্রহণ এবং সময়মতো অনুসন্ধান কার্যক্রম। বাস্তবে প্রক্রিয়ার গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর।

শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণের ফলে গ্যাসের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এই ব্যবধান পূরণে এলএনজি আমদানি ছিল বাস্তবসম্মত বিকল্প। এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধির সাথে প্রয়োজন ছিল সরবরাহ অবকাঠামোকে আরও স্থিতিশীল ও বহুমাত্রিক করে তোলা।

নীতিগত সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্য বৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাসহ বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতিই একটি দেশের জ্বালানি নীতির প্রকৃত পরীক্ষা। কেবল তাৎক্ষণিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলা নয়; ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, অনুসন্ধানে বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতারও পরীক্ষা। এখনই কার্যকর সংস্কার শুরু না হলে পরিস্থিতি আরো ভায়াবহ হবে। যার মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষ, শিল্পখাত এবং জাতীয় অর্থনীতিকে।

লেখক: গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী

গ্যাস সংকট গ্যাসের নিম্নচাপ বাংলাদেশে গ্যাস সংকট জ্বালানি সংকট শিল্পে গ্যাস সংকট জ্বালানি নীতি সরকার

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!