বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রতীকী চিত্র
বিদ্যুৎ এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ। বাসাবাড়ির আলো, শিল্পকারখানার উৎপাদন, কৃষির সেচ, হাসপাতালের সেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভিত্তিতে রয়েছে জ্বালানি। ফলে বিদ্যুৎ খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের সম্প্রসারণ করেছে। উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে এবং বিদ্যুতের আওতা বিস্তৃত হয়েছে। একই সময়ে শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ যথেষ্ট নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি কতটা নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী—সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থাপিত সক্ষমতা থাকলেই যে সেটি সবসময় পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারবে, এমন নয়। বিশেষ করে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকলে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো সম্ভব হয় না। আবার আমদানিকৃত জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে গেলে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ কমে এসেছে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় বহুমুখী উৎস দরকার
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রথম দিকগুলোর একটি হওয়া উচিত দেশীয় সম্পদের অনুসন্ধান ও দক্ষ ব্যবহার। গ্যাসের মজুত সীমিত হলেও নতুন সম্ভাব্য উৎস খোঁজা এবং বিদ্যমান ক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানও গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
তবে ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থা কেবল গ্যাসনির্ভর হলে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দেশীয় গ্যাসের পাশাপাশি এলএনজি, কয়লা, সৌরশক্তি এবং অন্যান্য সম্ভাব্য উৎসের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি মিশ্রণ গড়ে তোলা প্রয়োজন। কোন উৎসের খরচ কত, সরবরাহ কতটা নিশ্চিত এবং দীর্ঘমেয়াদে তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব কী—এসব বিষয় বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকিও কম নয়। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কিংবা বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটে জ্বালানির দাম দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। আমদানিনির্ভরতার ক্ষেত্রে তাই সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করা, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং প্রয়োজনীয় মজুত ব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হবে।
নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো
জ্বালানি নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য শক্তির ভূমিকা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভূমি সীমিত হলেও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা ও আবাসিক ভবনের ছাদকে কাজে লাগিয়ে বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে।
তবে সৌরবিদ্যুতের প্রসারের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে সৌরবিদ্যুৎ বেশি উৎপাদিত হলেও বিদ্যুতের চাহিদা সারাদিন থাকে। এ ব্যবধান সামলাতে ব্যাটারি স্টোরেজ, স্মার্ট গ্রিড ও আধুনিক মিটারিং প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে।
ভবিষ্যতের গ্রিডকে তাই শুধু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রকেন্দ্রিক না রেখে বিভিন্ন উৎসের বিদ্যুৎ সমন্বয় করতে সক্ষম ও নমনীয় করে তুলতে হবে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ও জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ
বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিলে সাশ্রয়ের আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দক্ষতা কেবল সংকটকালীন ব্যবস্থা হওয়া উচিত নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতির অংশ হওয়া প্রয়োজন।
শিল্পকারখানায় আধুনিক ও কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী যন্ত্রপাতি, ভবনে শক্তি-সাশ্রয়ী নকশা, দক্ষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী সরঞ্জামের ব্যবহার বাড়ানো গেলে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ দিয়ে বেশি অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।
নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পাশাপাশি অপচয় কমানোর বিষয়টিকেও অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। বিদ্যুতের চাহিদা ব্যবস্থাপনা সফল হলে নতুন অবকাঠামোর ওপর চাপও কমানো সম্ভব হতে পারে।
উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রিড আধুনিকায়ন জরুরি
বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, উৎপাদিত বিদ্যুৎ নির্ভরযোগ্যভাবে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতাও থাকতে হবে। পুরোনো সঞ্চালনলাইন, সাবস্টেশন ও বিতরণ অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং কারিগরি ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ তাই গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ চাহিদা কোথায় বাড়বে, তা বিবেচনায় নিয়ে আগেই সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর পরিকল্পনা করতে হবে। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণকে পৃথক প্রকল্প হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
বিদ্যুতের দাম ও প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের পাশাপাশি সাশ্রয়ী বিদ্যুৎও গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে শিল্পের খরচ, পণ্যের মূল্য এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ব্যয়েও তার প্রভাব পড়তে পারে।
তাই নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণের আগে উৎপাদন ব্যয়, প্রয়োজনীয় জ্বালানি, প্রযুক্তি, সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ের বিষয়গুলো কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। শুধু দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো নয়, প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য কতটা কার্যকর হবে—সেটিও বিবেচনায় থাকা উচিত।
এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ, বিনিয়োগের যৌক্তিকতা এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
বেসরকারি বিনিয়োগও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ের বিষয়গুলো স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
শিল্প ও কৃষিতে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ
শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ বা গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। এর প্রভাব শুধু উদ্যোক্তার ওপর পড়ে না; কর্মসংস্থান, রপ্তানি, পণ্যের মূল্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়ে।
কৃষিতেও বিদ্যুতের গুরুত্ব রয়েছে। সেচ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধু বিদ্যুৎ খাতের সমস্যা হিসেবে না দেখে সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আঞ্চলিক সহযোগিতার সুযোগ
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্য ও গ্রিড সংযোগ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় সহায়ক হতে পারে। তবে আমদানিনির্ভরতা যেন নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি না করে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
আঞ্চলিক সহযোগিতার লক্ষ্য হওয়া উচিত বিভিন্ন উৎস থেকে প্রয়োজনের সময় বিদ্যুৎ পাওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা। এতে জাতীয় গ্রিডের নমনীয়তা ও স্থিতিশীলতা বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে আধুনিক গ্রিড, নবায়নযোগ্য শক্তি, ব্যাটারি স্টোরেজ ও ডিজিটাল মিটারিংয়ের মতো প্রযুক্তির জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়িয়ে দেশীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি করা যেতে পারে।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় রোডম্যাপ
সব উদ্যোগকে একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনা জরুরি। আগামী পাঁচ, দশ বা তার বেশি সময়ের বিদ্যুৎ চাহিদা, জ্বালানি উৎস, নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনা, আমদানির ঝুঁকি এবং গ্রিড সম্প্রসারণ—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
এই পরিকল্পনায় শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না। বাস্তবায়নের সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, অগ্রগতি পরিমাপের পদ্ধতি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা সংশোধনের ব্যবস্থাও থাকা দরকার।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ-জ্বালানি সমস্যার সমাধান কোনো একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বা একটি জ্বালানি উৎসের ওপর নির্ভর করে সম্ভব নয়। দেশীয় সম্পদের অনুসন্ধান, জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তি, দক্ষ ব্যবহার, আধুনিক গ্রিড, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
বিদ্যুতের আলো মানুষের ঘরে পৌঁছানো উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু সেই আলো দীর্ঘমেয়াদে জ্বালিয়ে রাখতে হলে উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি জ্বালানির নিশ্চয়তাও নিশ্চিত করতে হবে। টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা তাই শুধু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রশ্ন নয়; এটি নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও বহুমুখী জ্বালানি ব্যবস্থারও প্রশ্ন।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী, কলামিস্ট।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকট বিদ্যুৎ উৎপাদন নবায়নযোগ্য জ্বালানি
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!