বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংকিং খাতের প্রতীকী চিত্র। ছবি: সংগৃহীত
দেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং খাতে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আমানত, প্রবাসী আয় এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকে চলমান অস্থিরতা ও তারল্য সংকটের প্রভাব পুরো খাতেই পড়তে শুরু করেছে। তবে সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর অবস্থান এখনো গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ শেষে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আমানত বৃদ্ধি পেলেও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা কমেছে। বর্তমানে দেশের মোট ব্যাংক আমানতের প্রায় ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ও বিনিয়োগ বেড়ে ৫ লাখ ২৬ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। গত তিন মাসে এ খাতে প্রায় ১ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগ যুক্ত হয়েছে। দেশের মোট ব্যাংক ঋণের প্রায় ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ এখনো ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বিনিয়োগ-আমানত অনুপাত আগের প্রান্তিকের তুলনায় কমে ০ দশমিক ৯০-এ নেমে এসেছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণও কিছুটা কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কিছু ইসলামী ব্যাংকে আমানত উত্তোলনের চাপ, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, দুর্বল সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং শরিয়াহভিত্তিক স্বল্পমেয়াদি তারল্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা খাতটির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি ব্যাংককে জরুরি তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক আন্তঃব্যাংক অর্থবাজার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা সম্ভব হয়।
ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বৈদেশিক লেনদেনেও দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩০ হাজার ৩২১ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম। একই সময়ে আমদানি নিষ্পত্তি কমে ৪১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ হ্রাস। প্রবাসী আয়ও কমে ২৫ হাজার ১১ কোটি টাকায় নেমেছে। এরপরও দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ২০ দশমিক ৫৪ শতাংশ এখনো ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই এসেছে।
খাতভিত্তিক বিনিয়োগ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন হয়েছে বৃহৎ শিল্প খাতে, যার অংশ প্রায় ৪০ শতাংশ। এরপর রয়েছে বাণিজ্য খাত। অন্যদিকে কৃষি, মৎস্য ও বন খাতে বিনিয়োগের অংশ এখনো তুলনামূলক কম। তবে কৃষি অর্থায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মার্চ শেষে এ খাতে বিনিয়োগ বেড়ে ১৭ হাজার ৯৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ৯৩ দশমিক ৩৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
সবুজ অর্থায়ন, নারী উদ্যোক্তা অর্থায়ন এবং ক্ষুদ্র অর্থায়নেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। মার্চ শেষে সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। নারী উদ্যোক্তা অর্থায়ন বেড়ে ৫ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র অর্থায়ন বেড়ে ৭ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
বর্তমানে দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ৭০০টি শাখা রয়েছে। এছাড়া প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামী শাখা ও পৃথক ইসলামী ব্যাংকিং সেবা মিলিয়ে মোট শাখার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৪৯টি। এ খাতে কর্মরত জনবলের সংখ্যা প্রায় ৪৮ হাজার ৯৩৫ জন হলেও আগের বছরের তুলনায় কর্মী সংখ্যা কমেছে।
অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদের মতে, পরিচালনায় সুশাসনের ঘাটতি, তারল্য সংকট এবং গ্রাহকদের আস্থাহীনতার কারণে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিকল্প ব্যাংকে লেনদেন সরিয়ে নিচ্ছেন। এর ফলে আমানত, রপ্তানি আয় এবং প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তিনি দ্রুত পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আর্থিক তথ্য নিয়মিত প্রকাশের মাধ্যমে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বিভিন্ন ব্যাংকের আমানত কমা বা বাড়া স্বাভাবিক বিষয়। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামী ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সুশাসন, জবাবদিহি, দক্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!