যুক্তরাষ্ট্র   মঙ্গলবার ৪ আগস্ট ২০২৬,১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

পাঁচ মাসের পথচলা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন অভিযাত্রায় অর্থনীতি

মুহাম্মদ আহসানুল রাসেল

মুহাম্মদ আহসানুল রাসেল

প্রকাশিত: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৭ PM

২৩
পাঁচ মাসের পথচলা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন অভিযাত্রায় অর্থনীতি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান । ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে কিছু সময় থাকে, যা কেবল দিনপঞ্জির পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; ভবিষ্যতের ইতিহাস রচনার ভিত্তিও হয়ে ওঠে। সেই বিবেচনায় নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে সময়টুকু আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ জনগণ তখন শুধু নতুন মুখ দেখে না, খোঁজে নতুন দর্শন, নতুন দিকনির্দেশনা এবং নতুন আস্থা।

সবার প্রত্যাশা থাকে অর্থনীতি নতুন গতি ফিরে পাবে, বিনিয়োগে গতি আসবে, কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলবে এবং উন্নয়নের সুফল কেবল পরিসংখ্যানে নয়, মানুষের জীবনেও দৃশ্যমান হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম পাঁচ মাসকে সেই প্রত্যাশার আলোতেই মূল্যায়ন করা উচিত।

কোনো সরকারের পাঁচ মাসকে সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার চূড়ান্ত মানদণ্ড বলা যায় না। কিন্তু এই সময়টুকুই বলে দেয় সরকার কোন পথে হাঁটতে চায়, কোন খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং আগামী দিনের রাষ্ট্র নির্মাণে তার ভাবনা কতটা সুসংগঠিত। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটা বলাই যায় গত পাঁচ মাসে সরকার অর্থনীতিকে শুধু দৈনন্দিন সংকট ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের একটি ভিত্তি নির্মাণের চেষ্টা করেছে।

তারেক রহমানের সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন দেশের অর্থনীতি নানা চাপের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পূর্ববর্তী সরকারের অব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগের মন্থর গতি এবং রাজস্ব ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা, সব মিলিয়ে অর্থনীতির সামনে ছিল কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। এই পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে দু’টো পথ খোলা ছিল। প্রথমত তাৎক্ষণিক জনপ্রিয় পথে হাঁটা, দ্বিতীয় বিকল্প ছিল জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত তৈরি করা। সরকার যদি কেবল তাৎক্ষণিক জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের পথে হাঁটত, তাহলে হয়তো সাময়িক প্রশংসা মিলত; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার সুফল নিয়ে শঙ্কা থেকেই যেত। বরং সরকারের নীতিগত অবস্থান ছিল অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর। এটি করতে যেয়ে সরকার সরকার তাৎক্ষনিক গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়কে আমলে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় জোর দেয়েছে।

যেকোনো অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আস্থা। অর্থনীতিতে একটি মৌলিক সত্য এই যে, আস্থা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। একজন বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করেন বিশ্বাসের ওপর, উদ্যোক্তা ঝুঁকি নেন সম্ভাবনার ওপর, আর সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রেখে।

সরকারের প্রথম পাঁচ মাসে সেই আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা ছিল স্পষ্ট। প্রশাসনিক জবাবদিহি, নীতিগত ধারাবাহিকতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি এসব উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল আস্থা ফিরিয়ে এনে অর্থনীতির ভিতকে আরও শক্তিশালী করা।

এই সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থানকে উন্নয়নের কেন্দ্রে নিয়ে আসা। প্রবৃদ্ধির হার যতই বাড়ুক, যদি তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হয়, তবে সেই প্রবৃদ্ধি সমাজে প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারে না। শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং সেবাখাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর সরকারের জোর তাই বাস্তবসম্মত বলতেই হয়।

বাংলাদেশের মতো দেশের সবচেয়ে বড়ো সম্পদ-শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। এই শক্তিকে উৎপাদনশীল সম্পদে পরিণত করতে পারলেই অর্থনীতির ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হবে। বন্ধ কারাখানাগুলো পুনরায় চালু করতে প্রধানমন্ত্রী যে গুরুত্ব দিচ্ছেন, তা কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির চাকা বেগবান করতে তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতির বার্তা দেয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থনৈতিক দর্শনে, কৃষির প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমাদের শহুরে টেবিল উন্নয়নের আলোচনায় অনেক সময় কৃষি আড়ালে পড়ে যায়। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ এখনো গ্রামেই স্পন্দিত হয়। কৃষকের ন্যায্যমূল্য, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এই চারটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি মূল্যস্ফীতির চাপও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। একটি আত্মনির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি শেষ পর্যন্ত মাটির সঙ্গেই যুক্ত থাকে। তারেক রহমানের সরকার কৃষিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়েই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছেন।

উন্নয়নের ক্ষেত্রেও আরেকটি বড়ো বিষয় নীতির ধারাবাহিকতা। সরকার এই ধারাবাহিকতার বার্তা দিয়েছে। নতুন প্রকল্পের ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু একটি দায়িত্বশীল সরকারের কাজ হলো চলমান প্রকল্পগুলোকে সময়মতো শেষ করা এবং জনগণের কাছে তার সুফল পৌঁছে দেওয়া। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, ডিজিটাল সেবা ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়নের মতো খাতগুলোতে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে আগামী দিনের বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতার ভিত্তি আরও শক্ত হবে।

অবশ্য পূর্ববর্তী সরকারগুলোর নেওয়া কিছু প্রকল্প বর্তমান সরকারের জন্য রীতিমতো দায়ে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে বিষয়টি বিচক্ষনতার সাথে মোকাবিলা করা সরকারের জন্য বড়ো চ্যালেঞ্জ।

অর্থনীতি কিন্তু কখনো বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে না। এখানে কেবল আর্থিক প্রতিষ্ঠান জড়িত এমনও নয়। এটি এগিয়ে নিতে হলে চাই সার্বিক কর্মপ্রয়াস। এখানে যেমন নীতি প্রণয়ন আছে তেমনি তা বাস্তবায়নে আইন, প্রশাসন, করব্যবস্থা এমন অনেকগুলো বিষয় জড়িত থাকে। থাকে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও বিনিয়োগ সংস্থার ভূমিকা। এর অনেককিছুই আমরা ভেঙে পড়তে দেখেছি অতীতে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নিয়েই বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশের স্বার্থে প্রতিটি ব্যবস্থায় আইনানুগ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন। যা নিশ্চিতভাবেই দেশে-বিদেশে তাঁর অর্থনৈতিক অবস্থানের প্রতি সমর্থন ও আস্থা বাড়াবে। বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্থনীতি এগিয়ে নিতে একান্ত আবশ্যক। সরকার অর্থনৈতিক কূটনীতিকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে পাশাপাশি দাতা সংস্থাগুলোর আস্থা অর্জনে কাজ করে চলেছে।

বাস্তবতা হলো, অর্থনৈতিক সংস্কারের ফল কখনো রাতারাতি আসে না। একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, রাজস্ব কাঠামো আধুনিক করা কিংবা প্রশাসনিক সংস্কারের সুফল মানুষের জীবনে পৌঁছাতে সময় লাগে।

তাই প্রথম পাঁচ মাসকে শেষ অধ্যায় নয়, বরং একটি দীর্ঘ যাত্রার সূচনা হিসেবে দেখা অধিকতর যুক্তিযুক্ত।

সরকারের সমালোচকেরা আরও দ্রুত পরিবর্তনের দাবি তুলবেন- এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আবার সরকারের সমর্থকেরা ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরবেন। ইতিহাস কিন্তু কোনো পক্ষের আবেগ দিয়ে নয়, সে বিচার করে ফলাফল দিয়ে। সেই বিচারে তারেক রহমানের সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো ঘোষিত নীতিকে বাস্তব সাফল্যে রূপান্তর করা।

রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা কোনো একক ব্যক্তি বা একক সরকারের অর্জন নয়; এটি জাতির সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। কিন্তু সেই যাত্রায় নেতৃত্বের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রথম পাঁচ মাসে সরকার যে অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা দিয়েছে, তা যদি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, যদি বিনিয়োগে গতি আসে, কর্মসংস্থান বাড়ে, বাজারে স্বস্তি ফিরে আসে এবং উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরে পৌঁছে যায়, তাহলে এই সময়টুকু একদিন কেবল একটি প্রশাসনিক সময়কাল হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সূচনা অধ্যায় হিসেবেই স্মরণ করা হবে।

 

লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক সবুজ নিশান

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!