যুক্তরাষ্ট্র   বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,৩১ ভাদ্র ১৪৩৩

৪৮ বছরের পথচলা: বিএনপি কি নতুন রাজনৈতিক ভাষা খুঁজে পাবে?

সবুজ নিশান ডেস্ক

সবুজ নিশান ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩২ PM ৩০০
৪৮ বছরের পথচলা: বিএনপি কি নতুন রাজনৈতিক ভাষা খুঁজে পাবে?

ছবি : সবুজ নিশান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু দল কেবল ক্ষমতার পালাবদলের অংশ নয়, বরং রাষ্ট্রের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সেই ধরনের একটি রাজনৈতিক শক্তি। আজ দলটির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। প্রায় অর্ধশতাব্দীর এই যাত্রাপথে বিএনপি কখনো রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, কখনো বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকেছে, কখনো দমন-পীড়নের মুখোমুখি হয়েছে, আবার কখনো গণআন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই দীর্ঘ পথচলা মূল্যায়নের দিন যেমন আজ, তেমনি আত্মসমালোচনা ও ভবিষ্যৎ ভাবনারও দিন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। সেই যুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার এবং পরবর্তীকালে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাওয়া শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন ধারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। স্বাধীনতা-উত্তর রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে তিনি জাতীয়তাবাদ, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারণাকে সামনে আনেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত বিএনপি ছিল সেই রাজনৈতিক দর্শনের সাংগঠনিক রূপ।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি ছিল দেশপ্রেমের বাস্তব প্রয়োগ। তিনি রাজনীতিকে কেবল বক্তৃতার মঞ্চে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং কৃষি, শিল্প, জনশক্তি রপ্তানি, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ এবং আত্মনির্ভর অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর সময়েই খাল খনন কর্মসূচি, গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির নানা উদ্যোগ সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্রকে নতুনভাবে পরিচিত করেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট এবং দৃঢ়। সেই কারণেই তিনি রাজনৈতিক সমর্থকের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় নেতৃত্বের মর্যাদা লাভ করেছিলেন।

জিয়াউর রহমানের আরেকটি বড় রাজনৈতিক শক্তি ছিল তাঁর সর্বজনগ্রাহ্যতা। তাঁর পৈতৃক শিকড় বগুড়ার সঙ্গে যুক্ত থাকায় উত্তরবঙ্গের মানুষের মধ্যে বিএনপির প্রতি একটি স্বাভাবিক আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে ফেনীর মেয়ে বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় রাজনীতিতে আবির্ভূত হওয়ার পর চট্টগ্রাম অঞ্চলে দলটির প্রতি এক ধরনের আবেগময় সমর্থন গড়ে ওঠে। এই দুই ভৌগোলিক বাস্তবতা-ফেনী ও বগুড়া-একসঙ্গে মিলে বিএনপিকে কেবল একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল নয়, বরং একটি সত্যিকারের জাতীয় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে। ফলে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথরিয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা অর্জন করেছিলেন জিয়াউর রহমান। এই ভালোবাসা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং সমগ্র বাংলাদেশে সমানভাবে বিস্তৃত হয়েছিল।

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল-দলটি কি তাঁর অনুপস্থিতিতে টিকে থাকতে পারবে? সেই কঠিন সময়ে বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসেন। একজন গৃহিণী থেকে জাতীয় নেত্রী হয়ে ওঠার তাঁর গল্প বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক আপসের পরিবর্তে নীতিগত অবস্থান ধরে রাখার কারণে তিনি “আপসহীন নেত্রী” হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ইতিহাসে এক মাইলফলক। সেই আন্দোলনে বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি একসঙ্গে ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু আন্দোলনের পর গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিএনপির ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন এবং রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি বড় ঘটনা।

তবে ইতিহাসের প্রতিটি রাজনৈতিক দলকেই সময়ের সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। বিএনপিও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রতিষ্ঠার চার দশক পর যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে, তা হলো-দলটি কি এখনো সেই পুরোনো রাজনৈতিক ফর্মুলার ওপর নির্ভর করছে? জনগণের প্রত্যাশা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাস্তবতা এবং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক চাহিদা বদলে গেছে। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্য ও কৌশলের ক্ষেত্রে অনেক সময় বিএনপিকে একই বৃত্তে ঘুরপাক খেতে দেখা যায়।

বাংলাদেশের বর্তমান তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ ১৯৯০-এর গণআন্দোলন কিংবা ১৯৭৫-৮১-এর রাজনৈতিক বাস্তবতা সরাসরি দেখেনি। তাদের কাছে রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, প্রযুক্তি, পরিবেশ, নগর ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় সেবার মানের ওপর। ফলে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে ধারণ করে নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করা। কেবল অতীতের গৌরবের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের রাজনীতি নির্মাণ করা সম্ভব নয়।
একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি কেবল তার প্রতিষ্ঠাতার জনপ্রিয়তায় নয়, বরং নতুন প্রজন্মকে কতটা আকৃষ্ট করতে পারছে, তার ওপরও নির্ভর করে। বিএনপির জন্য আজ প্রয়োজন নতুন চিন্তার, নতুন কর্মসূচির এবং নতুন নেতৃত্বের বিকাশ। শহীদ জিয়ার জাতীয়তাবাদকে একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত করা, বেগম খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক সংগ্রামের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের ভাষায় উপস্থাপন করা এবং তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের ধারণাগুলোকে বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়া-এসবই সময়ের দাবি।

তারেক রহমান আজ বিএনপির রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র এবং দলটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্থান-পতন, মামলা-মোকদ্দমা, নির্বাসিত জীবন এবং নানা প্রতিকুলতার মধ্য দিয়েও তিনি দলের সাংগঠনিক কাঠামোকে সক্রিয় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে রাজনৈতিক যোগাযোগ, তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের প্রশ্নে তিনি বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্যে নতুন মাত্রা যোগ করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা ক্ষমতার পরিবর্তনের চেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোগত সংস্কারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার একটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। তবে বাস্তবতা হলো, বিএনপির সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে-তরুণ ভোটারদের আস্থা অর্জন, নতুন রাজনৈতিক ভাষা নির্মাণ, নীতিনির্ভর রাজনীতিকে শক্তিশালী করা এবং জাতীয় ঐক্যের পরিসর বিস্তৃত করা-সেসব ক্ষেত্রে তারেক রহমানের নেতৃত্ব কতটা কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে, সেটিই আগামী দিনের বড় প্রশ্ন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী দর্শন এবং বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন গণতান্ত্রিক সংগ্রামের উত্তরাধিকারকে সমসাময়িক রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে যুক্ত করার দায়িত্ব এখন অনেকাংশে তাঁর কাঁধে। ফলে বিএনপির আগামী অধ্যায়ের সাফল্য বা ব্যর্থতা শুধু একটি দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির অবদান যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি তার সীমাবদ্ধতাও আলোচনার বাইরে রাখা যায় না। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়মিত আত্মসমালোচনা করতে হয় এবং জনগণের রায়ের সামনে নিজেদের উপস্থাপন করতে হয়। ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় বার্তা হতে পারে-ইতিহাসকে সম্মান, কিন্তু ইতিহাসে বন্দি নয়; ঐতিহ্যকে ধারণ, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য নতুন পথ নির্মাণ।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দেশপ্রেম, বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থান এবং বিএনপির দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রয়োজন নতুন রাজনৈতিক কল্পনা, নতুন রাষ্ট্রচিন্তা এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে নতুন সামাজিক চুক্তি। ৪৮ বছরের এই সন্ধিক্ষণে বিএনপির সামনে প্রশ্ন একটাই-দলটি কি অতীতের সাফল্যের স্মারক হয়ে থাকবে, নাকি নতুন বাংলাদেশের জন্য নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করবে?

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে শুধু বিএনপি নয়, পুরো বাংলাদেশ।

জাতীয়তাবাদী রাজনীতি বিএনপি

১ মন্তব্য


সেন্টার ফর বাংলাদেশ থিয়েটারের কর্মী

লেখাটি বিএনপির রাজনীতির জন্য খুবই দিকনির্দেশনামূলক, কিন্তু বিএনপিসহ অঙ্গসংগঠনগুলো এই লেখাটি কি পড়বে?

০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৬ AM